এসিআর । সার্ভিস বুক । স্মারকলিপি

গোপনীয় অনুবেদন নিয়ে বড় উদ্যোগ, ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের নির্দেশ

সরকারি কর্মকর্তাদের গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) প্রস্তুত, অনুস্বাক্ষর, প্রতিস্বাক্ষর ও ব্যবস্থাপনা আরও সঠিক ও কার্যকর করতে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিআর-৫ শাখা থেকে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়েছে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আয়োজনের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিআর অধিশাখা থেকে প্রতিনিধি বা রিসোর্স পারসন পাঠিয়ে সহযোগিতা করার কথাও জানানো হয়েছে।

কারা এই প্রশিক্ষণের আওতায়

চিঠিতে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা ‘গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা-২০২০’ অসামরিক প্রশাসনে নিয়োজিত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য। সরকারি গেজেটেও ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের সরকারি, আধা-সরকারি, সংযুক্ত দপ্তর, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত ও বিধিবদ্ধ সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এ অনুশাসনমালার আওতাভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশনার আলোকে মূলত যেসব কর্মকর্তার গোপনীয় অনুবেদন প্রস্তুত, অনুস্বাক্ষর, প্রতিস্বাক্ষর কিংবা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এসিআর ব্যবস্থাপনায় যেসব সমস্যা চিহ্নিত

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, সিআর অধিশাখায় সংরক্ষিত ও ব্যবস্থাপিত গোপনীয় অনুবেদন পর্যালোচনা করে বেশ কিছু লক্ষণীয় ত্রুটি পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো—

  • গোপনীয় অনুবেদন পূরণের ক্ষেত্রে তথ্যের ভুল বা অসঙ্গতি থাকা;
  • অনুবেদনাধীন কর্মকর্তা বা প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করা;
  • যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বিরূপ মন্তব্য বা মূল্যায়ন প্রদান;
  • অনুবেদনকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারীর দায়িত্ব পালনে প্রক্রিয়াগত ভুল থাকা;
  • গোপনীয় অনুবেদন প্রস্তুত ও ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি।

এসব ত্রুটির কারণে কোনো কোনো কর্মকর্তা তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি, পদায়ন, বৈদেশিক প্রশিক্ষণ/প্রেষণ কিংবা প্রশিক্ষণে মনোনয়নের ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলে মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

কেন এই প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি চাকরিতে একজন কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা, দায়িত্ব পালনের মান, আচরণ, পেশাগত সক্ষমতা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গোপনীয় অনুবেদন গুরুত্বপূর্ণ নথি। ফলে এতে তথ্যের ভুল, নিয়মবহির্ভূত মন্তব্য কিংবা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে তা কর্মকর্তার চাকরিজীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন শুধু এসিআর ফরম পূরণের বিষয় নয়, বরং অনুবেদনকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারীর দায়িত্ব, মূল্যায়নের পদ্ধতি এবং পুরো প্রক্রিয়ার নিয়মগত দিক সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও গোপনীয় অনুবেদন সংক্রান্ত একাধিক নির্দেশনা রয়েছে। এর মধ্যে যথাসময়ে এসিআর দাখিল, অনুস্বাক্ষর ও প্রতিস্বাক্ষর, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট ফরম ব্যবহারের বিষয়ে পৃথক নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে।

মাঠ প্রশাসনেও প্রশিক্ষণের নির্দেশ

চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—শুধু মন্ত্রণালয় বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর/সংস্থাকেও এর আওতায় আনার উদ্যোগ।

চিঠিতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, সংস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার প্রধানদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, গোপনীয় অনুবেদন ব্যবস্থাপনায় ভুল কমাতে কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত একটি অভিন্ন প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরির দিকেই এগোচ্ছে প্রশাসন।

প্রশিক্ষণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সহায়তা

প্রশিক্ষণ আয়োজনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিআর অধিশাখা থেকে প্রতিনিধি বা রিসোর্স পারসন পাঠানো হবে। এর ফলে প্রশিক্ষণগুলোতে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিধি, অনুশাসন ও বাস্তব প্রয়োগের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে গোপনীয় অনুবেদন তৈরির সময় ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা বা প্রচলিত অভ্যাসের পরিবর্তে নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কার্যালয়গুলোতে এখন কী করতে হবে

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে—

১. গোপনীয় অনুবেদন প্রস্তুত ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে;
২. প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে;
৩. ‘গোপনীয় অনুবেদন অনুশাসনমালা-২০২০’ অনুসরণের বিষয়টি প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে;
৪. অনুবেদনকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে;
৫. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

নতুন উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে দেখলে, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে এসিআর-ভিত্তিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নির্ভুলতা ও স্বচ্ছতায়। কারণ একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণে মনোনয়নের মতো বিষয়ে গোপনীয় অনুবেদনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ব্যবস্থায় ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য ২০২০ সালের অনুশাসনমালা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য পরবর্তী পর্যায়ে আলাদা অনুশাসনমালা চালু রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নির্দেশনাতেও এই পৃথক কাঠামো অনুসরণের বিষয়টি দেখা যায়।

ফলে নতুন প্রশিক্ষণ উদ্যোগকে শুধু একটি সাধারণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বরং এটি সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মমূল্যায়ন ব্যবস্থায় নিয়মতান্ত্রিকতা, ভুল কমানো এবং মূল্যায়নের মান উন্নয়নের একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

চিঠির মূল বার্তা

সার্বিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট—গোপনীয় অনুবেদন এখন শুধু একটি ফরম পূরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি নির্ধারিত বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব।

বিশেষ করে অনুবেদনকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে কোনো কর্মকর্তা যাতে চাকরিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর ও সংস্থাকে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আয়োজনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের এসিআর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দক্ষ করে তোলার নির্দেশনাটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *