জটিল রোগে আক্রান্ত অসচ্ছলদের সরকারি সহায়তা: আবেদন করতে লাগবে যেসব নথি, জেনে নিন নিয়ম
ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ, লিউকেমিয়া ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত অসচ্ছল মানুষের চিকিৎসার ব্যয় বহনে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের এ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী রোগীদের চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সহায়তা পেতে হলে আবেদনকারীদের সঠিকভাবে আবেদন ফরম পূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগের চিকিৎসায় অনেক পরিবারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। নিয়মিত ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি, ডায়ালাইসিস কিংবা অস্ত্রোপচারের খরচ বহন করতে গিয়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি এই কর্মসূচি যোগ্য অসচ্ছল রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।
কোন কোন রোগে পাওয়া যায় আর্থিক সহায়তা?
সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে নির্ধারিত কয়েকটি জটিল রোগে আক্রান্ত অসচ্ছল ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ক্যান্সার
২. কিডনি রোগ
৩. লিভার সিরোসিস
৪. স্ট্রোকে প্যারালাইজড বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থা
৫. জন্মগত হৃদরোগ
৬. থ্যালাসেমিয়া
আবেদনসংক্রান্ত প্রদত্ত ফরমে লিউকেমিয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে রোগের শ্রেণিবিন্যাস, যোগ্যতা এবং বর্তমানে কোন কোন রোগের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আর্থিক সহায়তার পরিমাণ কত?
আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নিয়ে আবেদনকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত তথ্যে এককালীন এক লাখ টাকা সহায়তার কথা বলা হলেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত কর্মসূচির তথ্যে এককালীন ৫০ হাজার টাকা অনুদানের উল্লেখ রয়েছে। তাই সর্বশেষ সরকারি আদেশ বা সংশোধিত নীতিমালা যাচাই না করে এক লাখ টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত বলে প্রচার করা উচিত নয়।
সহায়তার পরিমাণ, বরাদ্দ, আবেদন গ্রহণের সময়সীমা এবং নির্বাচনের নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। এ কারণে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা, শহর বা হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয় থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
আবেদন করতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত। প্রদত্ত আবেদন ফরমে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হতে পারে—
- রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি। অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ।
- রোগীর পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবেদনকারী বা অভিভাবকের পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- নমিনির প্রয়োজনীয় পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য।
- রোগী বা প্রযোজ্য আবেদনকারী কিংবা অভিভাবকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য।
- ব্যাংক হিসাবের চেক বইয়ের কভার পাতার ফটোকপি।
- চিকিৎসকের সর্বশেষ ব্যবস্থাপত্রের ফটোকপি।
- রোগ শনাক্তকরণের প্রাসঙ্গিক পরীক্ষার রিপোর্টের সত্যায়িত ফটোকপি।
- আবেদন ফরমে চাওয়া অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি।
আবেদনপত্রে নাম, জন্মতারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্য নির্ভুলভাবে লিখতে হবে। কোনো তথ্যের সঙ্গে অন্য নথির অমিল থাকলে যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
রোগভেদে কোন পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হবে?
আর্থিক সহায়তার আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রোগের প্রমাণ হিসেবে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি গুরুত্বপূর্ণ। রোগভেদে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ধরনও আলাদা।
ক্যান্সার: বায়োপসি, হিস্টোপ্যাথলজি, সাইটোপ্যাথলজি, বোন ম্যারো রিপোর্ট অথবা রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হতে পারে।
কিডনি রোগ: রক্তের ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষার রিপোর্টের পাশাপাশি ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনসংক্রান্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
লিভার সিরোসিস: লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রাম, ফাইব্রোস্ক্যান এবং রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট সংযুক্ত করতে হবে।
প্যারালাইসিস: রোগের ধরন ও কারণ অনুযায়ী MRI বা CT Scan রিপোর্ট অথবা প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা নথি দিতে হতে পারে।
হৃদরোগ: এনজিওগ্রাম, ইকোকার্ডিওগ্রাম এবং রোগ নির্ণয়ে সহায়ক অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া ও লিউকেমিয়া: হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিসসহ রোগের ধরন অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দিতে হতে পারে।
রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা, সত্যায়নের নিয়ম এবং কত দিনের মধ্যে করা পরীক্ষার রিপোর্ট গ্রহণ করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত। পুরোনো রিপোর্টের পরিবর্তে হালনাগাদ পরীক্ষার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কীভাবে আবেদন করবেন?
আবেদন করতে হলে প্রথমে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির আবেদন ফরম ও নির্দেশনা সংগ্রহ করতে হবে। অনলাইনে আবেদন চালু থাকলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ফরম পূরণ করে আবেদন জমা দিতে হবে।
এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনের স্বাক্ষরিত প্রিন্টকপি, চিকিৎসকের সর্বশেষ ব্যবস্থাপত্র এবং রোগ শনাক্তকরণের রিপোর্টের সত্যায়িত কপি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
আবেদন জমা দেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে সব ঘর যথাযথভাবে পূরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত রয়েছে। কোনো নথি বাদ পড়লে বা তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদন যাচাইয়ে বিলম্ব হতে পারে।
সাধারণত সংশ্লিষ্ট উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়, শহর সমাজসেবা কার্যালয় অথবা হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে আবেদন গ্রহণের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় নথি এবং জমা দেওয়ার সময়সীমা জানা যায়। সরকারি ওয়েবসাইটেও কর্মসূচি ও আবেদনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
আবেদন করলেই কি টাকা পাওয়া যাবে?
না। আবেদন জমা দিলেই আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত হয় না। আবেদনকারীর যোগ্যতা, রোগের প্রমাণ, আর্থসামাজিক অবস্থা, প্রয়োজনীয় নথি এবং কর্মসূচির বরাদ্দ বিবেচনায় যাচাই-বাছাই করা হয়। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
এ কারণে আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত কাগজপত্র সরবরাহের প্রস্তুতি রাখা ভালো।
একই ব্যক্তি কতবার সহায়তা পেতে পারেন?
প্রচারিত তথ্যে একই অর্থবছরে একজন আবেদনকারী একবার এবং জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ তিনবার সহায়তা পাওয়ার সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই শর্ত বর্তমানে কার্যকর নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সরকারি নির্দেশনা যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
জটিল রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ আর্থিক সংকটের পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কেও যথেষ্ট তথ্য জানেন না। বিশেষ করে দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারের রোগীদের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, আবেদন ফরম পূরণ এবং সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারেন। আবেদন ফরম সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেওয়া এবং সঠিক সরকারি কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে সহযোগিতা করলে একজন অসহায় রোগীর জন্য সরকারি সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ হতে পারে।
তবে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীকে টাকা দেওয়া বা নিশ্চিত অনুদানের নামে প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আবেদন ও সহায়তার প্রকৃত নিয়ম জানতে সরাসরি সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।


