জাতীয় বেতন স্কেলে সমতাকরণ জটিলতা: জুনিয়রদের বেতন সিনিয়রদের চেয়ে বেশি, সমাধান চান সরকারি কর্মচারীরা
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন কাঠামোর পর ২০১৫ ও ২০২৬ সালের বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ ও সমতাকরণে জটিলতার অভিযোগ তুলেছেন সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, বেতন নির্ধারণের বিভিন্ন ধাপে সমন্বয়হীনতার কারণে একই পদে বা তুলনীয় পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মচারী বেশি মূল বেতন পেতে পারেন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি তুলনামূলক হিসাবচিত্রে দুই কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে সমস্যাটির সম্ভাব্য চিত্র দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মতে, বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তবে ছবিতে উপস্থাপিত হিসাবটি একটি উদাহরণভিত্তিক তুলনা; এর মাধ্যমে সব সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে একই সমস্যা ঘটছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
পদোন্নতির পরও বেতন সমতাকরণ নিয়ে প্রশ্ন
ছবিতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, কমল ১৫তম গ্রেডে কর্মরত ছিলেন এবং ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর মূল বেতন ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ টাকা। অন্যদিকে, সজল ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ১১তম গ্রেডে উন্নীত হন। বেতন নির্ধারণের পর তাঁর মূল বেতন দেখানো হয়েছে ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা।
পরবর্তী বছরগুলোর হিসাবচিত্রে দুজনের মূল বেতন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের ১ জুলাই কমলের মূল বেতন ২২ হাজার ৩৭০ টাকা এবং সজলের ২২ হাজার ৫৩০ টাকা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ওই তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী সজলের মূল বেতন কমলের চেয়ে ১৬০ টাকা বেশি।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর অধীনে উপস্থাপিত হিসাবেও একই ধরনের প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে। ছবিতে ২০২৬ সালের ১ জুলাই কমলের মূল বেতন ৩৯ হাজার টাকা এবং সজলের ৩৭ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের সম্ভাব্য হিসাবেও যথাক্রমে ৪১ হাজার ও ৩৮ হাজার ৮০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমল ও সজলের পদ, গ্রেড, পদোন্নতির তারিখ, পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণ এবং নতুন বেতন কাঠামোর প্রযোজ্য বিধান একসঙ্গে যাচাই না করে এই পার্থক্যকে সরাসরি বেতন নির্ধারণের ত্রুটি বলা যাবে না। ছবির হিসাবটি সরকারি আদেশ বা অনুমোদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণী দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০১৫ ও ২০২৬ সালের পে-স্কেলে কেন জটিলতা হতে পারে?
সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারণ শুধু বর্তমান গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন অনুসরণ করে সম্পন্ন হয় না। কর্মচারীর পূর্ববর্তী মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের বিধানও গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামো থেকে ২০২৬ সালের নতুন কাঠামোয় যাওয়ার সময় পুরোনো মূল বেতনের সঙ্গে নতুন স্কেলের ধাপের সামঞ্জস্য নির্ধারণ করতে হয়। নতুন স্কেলে পুরোনো বেতনের সমপরিমাণ কোনো ধাপ না থাকলে প্রযোজ্য বিধি অনুসারে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় আসে।
এ কারণে দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারী এবং তুলনামূলকভাবে কম জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে পার্থক্য দেখা দিলে সেটি পৃথকভাবে পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে পদোন্নতির সময় বেতন নির্ধারণ এবং পরবর্তী ইনক্রিমেন্টের হিসাব সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের করণীয়
সরকারি কর্মচারীদের উত্থাপিত অভিযোগের সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
১. বেতন সমতাকরণসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই: বিভিন্ন দপ্তর থেকে একই পদে বা তুলনীয় পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের তুলনামূলক তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।
২. পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের হিসাব পুনঃপর্যালোচনা: পদোন্নতির আগে ও পরে মূল বেতন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও বিধিমালার আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
৩. iBAS++-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন: কোনো ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের নিয়ম, তথ্য সংরক্ষণ বা বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি শনাক্ত হলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থ বিভাগের অধীনে iBAS++ ব্যবস্থায় জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর বেতন নির্ধারণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সরকারি নোটিশ প্রকাশিত হয়েছে।
৪. স্পষ্ট নির্দেশনা প্রকাশ: কোন পরিস্থিতিতে বেতন সমতাকরণ প্রযোজ্য হবে, পদোন্নতির পর বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং কোনো কর্মচারীর বেতন কম জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর তুলনায় কম হলে কী প্রতিকার পাওয়া যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।
৫. আপত্তি নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা: বেতন নির্ধারণের বিবরণীতে অসংগতি দেখা দিলে কর্মচারীরা যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় সমাধান পান, সে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা। তাই বেতন নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মচারীদের দাবি, বেতন সমতাকরণসংক্রান্ত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রকৃত অসংগতি শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজন হলে বিদ্যমান বিধি ব্যাখ্যা করে নির্দেশনা দিতে হবে এবং বিধিগত বা প্রশাসনিক ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করতে হবে।
বিশেষ করে ২০০৯, ২০১৫ ও ২০২৬ সালের বেতন কাঠামোর মধ্যবর্তী পরিবর্তন, পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণ এবং নতুন স্কেলে মূল বেতন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো কর্মচারী যেন অনিচ্ছাকৃতভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সময় জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীদের বেতনে অপ্রত্যাশিত পার্থক্য দেখা দিলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে সব ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মচারী বেশি বেতন পাচ্ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট বেতন নির্ধারণী বিবরণী ও সরকারি বিধান পরীক্ষা করতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা, অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা, সংশোধন ও নির্দেশনা দেবে। এতে বেতন নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে এবং সরকারি চাকরিতে ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।


