জিপিএফের লভ্যাংশ কি সুদ? শরিয়াহসম্মত বিকল্প, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি কর্মচারীদের সঞ্চয় সুরক্ষা নিয়ে নতুন আলোচনা
জিপিএফের লভ্যাংশ কি সুদ? শরিয়াহসম্মত বিকল্প, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি কর্মচারীদের সঞ্চয় সুরক্ষা নিয়ে নতুন আলোচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কর্মচারীদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বা জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ) পরিচালনা, জমাকৃত অর্থের বিপরীতে সরকারের দেওয়া আর্থিক সুবিধা এবং সুদমুক্ত জিপিএফ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য সংরক্ষণ, মূল্যস্ফীতির প্রভাব, শরিয়াহর দৃষ্টিতে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং বিকল্প বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন মত উঠে এসেছে।
অর্থ বিভাগের ২০২০ সালের ১৭ জুন জারি করা একটি পরিপত্রে ভবিষ্য তহবিলের হিসাব প্রদানসংক্রান্ত বিদ্যমান ফরমে সুদবিহীন ভবিষ্য তহবিল হিসাবের ক্ষেত্রে ‘সুদ/ইনক্রিমেন্ট’-এর পরিবর্তে ‘মুনাফা’ শব্দটি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিপত্রে বলা হয়, মুসলিম সরকারি কর্মচারীদের সুদবিহীন ভবিষ্য তহবিল হিসাবের ক্ষেত্রে প্রচলিত হিসাব ফরমে ব্যবহৃত ‘Interest’ বা ‘Interest or increment’ শব্দের পরিবর্তে ‘মুনাফা’ শব্দটি লিখতে হবে।
তবে শুধু পরিভাষা পরিবর্তন করলেই কোনো আর্থিক সুবিধার শরিয়াহগত প্রকৃতি পরিবর্তিত হয় কি না—এ প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। তাদের মতে, একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখার বিপরীতে যদি পূর্বনির্ধারিত হারে অতিরিক্ত অর্থ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার চুক্তিগত কাঠামো, অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, মুনাফা কীভাবে অর্জিত হচ্ছে এবং লোকসানের ঝুঁকি কে বহন করছে—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সুদমুক্ত জিপিএফে মূলধনের প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা
আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে মূল্যস্ফীতি। একজন সরকারি কর্মচারী ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরিজীবনে নিয়মিত জিপিএফে অর্থ জমা রাখলে দীর্ঘ সময় পর সেই অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কোনো কর্মচারী যদি সুদ বা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ না করে শুধু নিজের জমাকৃত মূলধন ফেরত নেন, তাহলে কয়েক দশকের মূল্যস্ফীতির কারণে সেই অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
আজকের এক লাখ টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব, ২৫ বা ৩০ বছর পর একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব নাও হতে পারে। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সুদ এড়িয়ে চলতে ইচ্ছুক সরকারি কর্মচারীদের সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
শরিয়াহ কি ‘টাইম ভ্যালু অব মানি’ স্বীকার করে?
এ আলোচনায় অর্থনীতির বহুল ব্যবহৃত ধারণা ‘টাইম ভ্যালু অব মানি’ বা অর্থের সময়মূল্যও উঠে এসেছে।
ইসলামী অর্থনীতিতে অর্থের সময়মূল্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে নগদ ও বাকিতে পণ্য বিক্রির মূল্য ভিন্ন হতে পারে। তবে কেবল অর্থ ঋণ দেওয়ার কারণে সময়ের বিপরীতে পূর্বনির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণকে শরিয়াহসম্মত মুনাফা হিসেবে গণ্য করা হয় না।
অর্থাৎ, মুনাফার বৈধতার জন্য সাধারণভাবে ব্যবসা, সম্পদ, বিনিয়োগ, মালিকানা অথবা ঝুঁকি গ্রহণের মতো বাস্তব অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
এ কারণে মূল্যস্ফীতির ক্ষতি পূরণ এবং সুদের বিকল্প হিসেবে শরিয়াহসম্মত ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়টি সরল নয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামি অর্থনীতি, শরিয়াহ এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার সমপরিমাণ অর্থ দিলে সেটি কি সুদ হবে?
আলোচনায় প্রস্তাব এসেছে, কোনো কর্মচারী তার বেতনের ৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জিপিএফে জমা করলে সরকারও নির্দিষ্ট হারে অর্থ দিতে পারে। এরপর সমন্বিত তহবিল শরিয়াহসম্মত খাতে বিনিয়োগ করে অর্জিত মুনাফা কর্মচারী ও সরকারের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে।
তবে এ প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার যদি কর্মচারীর জমার বিপরীতে নিশ্চিতভাবে সমপরিমাণ অর্থ দেয়, তাহলে সেই অর্থের আইনগত ও চুক্তিগত প্রকৃতি কী হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের দেওয়া অর্থ যদি চাকরির শর্ত অনুযায়ী ‘Employer Contribution’ বা নিয়োগকর্তার অবদান হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সেটি ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত সুদের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক বিষয় নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মচারীর অবসরকালীন সঞ্চয়ে নিয়োগকর্তার অবদান রাখার ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে সরকারের অবদান এবং কর্মচারীর অর্থ একত্র করে বিনিয়োগের পর যদি মূলধন ও নির্দিষ্ট মুনাফা শতভাগ নিশ্চিত করা হয়, তাহলে শরিয়াহগত প্রশ্ন থেকেই যাবে।
অন্যদিকে প্রকৃত মুদারাবা বা মুশারাকাভিত্তিক ব্যবস্থায় তহবিল শরিয়াহসম্মত খাতে বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকৃত মুনাফা পূর্বনির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হবে এবং বিনিয়োগের স্বাভাবিক ঝুঁকির নীতিও অনুসরণ করতে হবে।
‘মুনাফা’ নাম দিলেই কি অর্থ হালাল হয়ে যায়?
সরকারি কর্মচারীদের একাংশের বক্তব্য, সরকার বেতন, ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করে। এসব সুবিধা বৈধ হলে জিপিএফে সরকারের দেওয়া আর্থিক সুবিধা কেন অবৈধ হবে?
এ প্রশ্নের উত্তরে ইসলামি অর্থনীতির সাধারণ নীতি অনুযায়ী বলা যায়, কোনো অর্থের শরিয়াহগত বৈধতা শুধু অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং অর্থ প্রদানের চুক্তি ও কারণের ওপর নির্ভর করে।
বেতন হচ্ছে কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক। ভাতা চাকরির শর্ত অনুযায়ী দেওয়া সুবিধা। বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে বেতন কাঠামোর অংশ।
অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ জমা বা ঋণ দেওয়ার বিপরীতে পূর্বনির্ধারিত ও নিশ্চিত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে ভিন্ন শরিয়াহগত বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
ফলে জিপিএফে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থকে ‘সুদ’, ‘ইনক্রিমেন্ট’ বা ‘মুনাফা’—যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এর প্রকৃত চুক্তিগত কাঠামো ও অর্থ ব্যবহারের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেই শরিয়াহগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
বাধ্যতামূলক জিপিএফ সদস্যপদ বাতিলের প্রস্তাব
আলোচনায় আরও একটি বিকল্প প্রস্তাব উঠে এসেছে। সেটি হলো—যেসব সরকারি কর্মচারী ধর্মীয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত কারণে জিপিএফে অর্থ রাখতে চান না, তাদের জন্য অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা।
তাদের মতে, কর্মচারীদের সামনে কয়েকটি বিকল্প রাখা যেতে পারে। প্রচলিত জিপিএফ ব্যবস্থা, সুদমুক্ত বা শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট শর্তে জিপিএফে অংশগ্রহণ না করার সুযোগ—এ ধরনের কাঠামো থাকলে প্রত্যেক কর্মচারী নিজের বিশ্বাস ও আর্থিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তবে জিপিএফ সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা ও অবসরকালীন সঞ্চয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হওয়ায় বাধ্যবাধকতা পুরোপুরি প্রত্যাহারের আগে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ক্রেডিট কার্ডের সুদের সঙ্গে জিপিএফের তুলনা কতটা যৌক্তিক?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন এবং বিলম্বে পরিশোধ করলে সুদ দেন। তাহলে জিপিএফের আর্থিক সুবিধা নিয়ে এত আলোচনা কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, একটি আর্থিক ব্যবস্থায় সুদের উপস্থিতি অন্য আরেকটি ব্যবস্থার শরিয়াহগত বৈধতা প্রমাণ করে না। প্রতিটি চুক্তি ও লেনদেনকে তার নিজস্ব কাঠামো অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে হয়।
একইভাবে সরল সুদ ও চক্রবৃদ্ধি সুদের মধ্যে আর্থিক পার্থক্য থাকলেও শরিয়াহর আলোচনায় মূল প্রশ্ন হচ্ছে ঋণ বা অর্থের বিপরীতে শর্তযুক্ত অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের চুক্তিগত প্রকৃতি।
সমাধান হতে পারে পৃথক শরিয়াহসম্মত জিপিএফ তহবিল
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে একটি পৃথক ‘শরিয়াহসম্মত সরকারি ভবিষ্য তহবিল’ গঠনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এ ধরনের তহবিলে কর্মচারীদের জমাকৃত অর্থ সুকুক, শরিয়াহসম্মত অবকাঠামো প্রকল্প, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অনুমোদিত বিনিয়োগ মাধ্যম এবং অন্যান্য সম্পদভিত্তিক খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
তহবিল পরিচালনার জন্য স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট, নিয়মিত অডিট, বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ এবং মুনাফা বণ্টনের স্বচ্ছ নীতিমালা রাখা যেতে পারে।
পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগকর্তার অবদান বা ‘Employer Contribution’ চালুর সম্ভাবনাও আর্থিক সক্ষমতা ও নীতিগত দিক বিবেচনা করে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মুনাফার নিশ্চয়তা দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃত বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা হলে তা প্রচলিত সুদভিত্তিক কাঠামো থেকে আলাদা একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রয়োজন নীতিগত ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা
জিপিএফের মূল উদ্দেশ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সুদ পরিহার করতে ইচ্ছুক কর্মচারীদের জন্য কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ‘সুদ’-এর পরিবর্তে ‘মুনাফা’ শব্দ ব্যবহার, মূলধন ফেরত দেওয়া অথবা নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের মধ্যে সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও থাকতে পারে।
তাই অর্থনীতিবিদ, ইসলামি অর্থনীতি ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ, অ্যাকচুয়ারি, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করার দাবি উঠতে পারে।
একটি স্বচ্ছ, বিনিয়োগভিত্তিক ও শরিয়াহসম্মত বিকল্প জিপিএফ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হলে একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণে আগ্রহী সরকারি কর্মচারীরা কার্যকর বিকল্প পাবেন, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য হারানোর ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, জিপিএফের আর্থিক সুবিধা ‘সুদ না মুনাফা’—শুধু এই বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারি কর্মচারীদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ কাঠামো—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য ভবিষ্য তহবিল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।



