সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

নতুন পে স্কেলে বেতন সমতাকরণ: জুনিয়র বেশি বেতন পেলে সিনিয়রের বেতন কি সমান করার সুযোগ আছে?

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো—একই পদে কর্মরত দুই কর্মচারীর মধ্যে জুনিয়ন কর্মচারী যদি সিনিয়র কর্মচারীর চেয়ে বেশি মূল বেতন পান, তাহলে সিনিয়র কর্মচারীর বেতন কি সমতাকরণ করা যাবে?

বিশেষ করে ২০০৯ সালের জাতীয় বেতনস্কেলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেতন সমতাকরণের সুযোগ ছিল—এমন অভিজ্ঞতা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের বেতন কাঠামো চালুর পর এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়। এবার ২০২৬ সালের নতুন বেতন আদেশে পে-ফিক্সেশনের বিস্তারিত নিয়ম প্রকাশ হওয়ায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে, নতুন স্কেলে পুরোনো সেই সমতাকরণের সুযোগ ফিরেছে কি না।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সরকার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের গেজেট তালিকায় এটি এস.আর.ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে এবং গেজেটের পৃষ্ঠা ২৫১৯৩ থেকে ২৫২১১ পর্যন্ত বিস্তৃত।

২০০৯ সালের ব্যবস্থার সঙ্গে ২০২৬ সালের পার্থক্য কোথায়?

২০০৯ সালের জাতীয় বেতনস্কেলে বিভিন্ন পর্যায়ে সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল এবং সংশ্লিষ্ট বেতন সুবিধা পাওয়ার বিধান ছিল। সরকারি গেজেটের বিভিন্ন নথিতে ২০০৯ সালের স্কেলের ৪ বছর চাকরি পূর্তিতে সিলেকশন গ্রেড এবং ৮ বছর পূর্তিতে পরবর্তী সুবিধা প্রদানের উদাহরণও পাওয়া যায়।

এই ব্যবস্থার ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পদে কর্মরত কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন চাকরি করা কর্মচারীর বেতন কম এবং তুলনামূলকভাবে জুনিয়র কর্মচারীর বেতন বেশি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সংশোধনের জন্য সমতাকরণের দাবি বা ব্যবস্থা সামনে আসত।

কিন্তু ২০১৫ সালের বেতনস্কেলে আগের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ায় এই বিষয়টি নতুনভাবে পরিচালিত হয়। অর্থ বিভাগের বর্তমান ওয়েবসাইটেও জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫-এর পৃথক সরকারি আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষিত রয়েছে।

২০২৬ সালের পে স্কেলে কী বলা হয়েছে?

নতুন বেতন আদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমান বেতনস্কেলের বিপরীতে ২০২৬ সালের অনুরূপ স্কেল নির্ধারণের নিয়ম।

গেজেট অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগে কোনো কর্মচারী যে মূল স্কেল, উচ্চতর গ্রেড, ভিন্ন গ্রেড বা স্কেলেই বেতন পেয়ে থাকুন না কেন, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে তাঁর বিদ্যমান স্কেলের বিপরীতে নির্ধারিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর অনুরূপ স্কেল কার্যকর হবে।

এরপর প্রত্যেক কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতনকে নতুন স্কেলে নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট হিসাব অনুসরণ করতে হবে।

বেতন নির্ধারণের মূল পদ্ধতি

কোনো কর্মচারী যদি পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পেয়ে থাকেন, তাহলে নতুন অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হবে।

আর যদি তাঁর বর্তমান মূল বেতন পুরোনো স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রথমে—

বর্তমান মূল বেতন – বর্তমান স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন = পার্থক্য

এই পার্থক্য নতুন অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করে নতুন বেতন নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। নতুন স্কেলে যদি ঠিক সেই অঙ্কের কোনো ধাপ না থাকে, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।

এখানেই ২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশনের সঙ্গে বেতন সমতাকরণের ধারণাটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।


“অনুরূপ স্কেল” কি “বেতন সমতাকরণ”?

না—দুটি বিষয় এক নয়।

অনুরূপ স্কেল বলতে বোঝায়, একজন কর্মচারী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে বেতনস্কেলে ছিলেন, সেটির বিপরীতে ২০২৬ সালের নতুন স্কেলের কোন স্কেল প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে বেতন সমতাকরণ বলতে সাধারণভাবে বোঝানো হয়—একই পদ বা সমপর্যায়ের দুই কর্মচারীর মধ্যে কোনো কারণে জুনিয়ন কর্মচারী সিনিয়রের চেয়ে বেশি মূল বেতন পেলে নির্দিষ্ট বিধানের মাধ্যমে সিনিয়রের বেতন জুনিয়রের বেতনের পর্যায়ে উন্নীত করা।

২০২৬ সালের গেজেটে অনুরূপ স্কেল ও পে-ফিক্সেশনের নিয়ম স্পষ্টভাবে আছে। কিন্তু “জুনিয়র কর্মচারীর বেতন সিনিয়রের চেয়ে বেশি হলে সিনিয়রের বেতন জুনিয়রের সমান করতে হবে”—এমন স্বতন্ত্র সাধারণ সমতাকরণ বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে বলে গেজেটের যে অংশগুলো যাচাই করা গেছে, তাতে পাওয়া যাচ্ছে না।


একটি সহজ উদাহরণ

ধরা যাক একই পদে দুই কর্মচারী রয়েছেন।

সিনিয়র কর্মচারী–A

  • চাকরিতে যোগদান করেছেন আগে
  • দীর্ঘ সময় চাকরি করেছেন
  • বর্তমান মূল বেতন: ৩২,০০০ টাকা

জুনিয়র কর্মচারী–B

  • পরে চাকরিতে যোগদান করেছেন
  • কোনো উচ্চতর গ্রেড বা পূর্ববর্তী সুবিধার কারণে
  • বর্তমান মূল বেতন: ৩৪,০০০ টাকা

এখন নতুন পে স্কেলে দুজনের বেতন নিজ নিজ বর্তমান বেতন, সংশ্লিষ্ট পুরোনো স্কেল এবং ২০২৬ সালের অনুরূপ স্কেলের ভিত্তিতে আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হবে।

শুধু এই কারণে যে A সিনিয়র এবং B জুনিয়র, A-এর বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে B-এর ৩৪,০০০ টাকায় উন্নীত হবে—২০২৬ সালের গেজেটে এমন সাধারণ সমতাকরণ বিধান স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।

অর্থাৎ পে-ফিক্সেশনের নিয়ম প্রয়োগ করার পরও যদি জুনিয়র কর্মচারী সিনিয়রের চেয়ে বেশি বেতন পান, শুধু সেই কারণেই সিনিয়রের বেতন সমান করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বর্তমান গেজেটের ভাষা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।


তাহলে কি কোনোভাবেই সমতাকরণ সম্ভব নয়?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে।

“গেজেটে সাধারণ সমতাকরণ বিধান নেই”—এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগ ব্যাখ্যা, পরিপত্র বা সংশোধনী দিয়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে না।

নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর পে-ফিক্সেশন হবে। সেই প্রক্রিয়ায় যদি দেখা যায়—

  • একই পদে সিনিয়র কর্মচারীর বেতন জুনিয়রের চেয়ে কম;
  • উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখের কারণে বেতন বৈষম্য তৈরি হয়েছে;
  • পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের কারণে জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী বেতন কমে গেছে;
  • একই পদে যোগদানের তারিখের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জুনিয়র বেশি বেতন পাচ্ছেন;

তাহলে এসব ক্ষেত্রে আলাদা ব্যাখ্যামূলক নির্দেশনা প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমান গেজেট অবশ্য মূলত নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন পদোন্নতি, নতুন নিয়োগ এবং অন্যান্য অবস্থায় বেতন নির্ধারণের বিধানও এতে রাখা হয়েছে।


২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশনে “পরবর্তী উচ্চতর ধাপ” কেন গুরুত্বপূর্ণ?

নতুন স্কেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হলো—হিসাব করে যদি এমন কোনো অঙ্ক পাওয়া যায় যা নতুন স্কেলের নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে হুবহু মেলে না, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।

এটি সমতাকরণ নয়, বরং নতুন বেতনস্কেলের ধাপের মধ্যে কর্মচারীর বেতন বসানোর একটি নিয়ম।

অর্থাৎ—

পুরোনো বেতনকে নতুন স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে; কিন্তু দুই কর্মচারীর পারস্পরিক বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য আলাদা সমতাকরণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।


২০০৯ বনাম ২০১৫ বনাম ২০২৬: এক নজরে

বিষয়২০০৯২০১৫২০২৬
সিলেকশন গ্রেড/টাইমস্কেলছিলকাঠামো পরিবর্তিতনতুন কাঠামো
বর্তমান স্কেলের বিপরীতে নতুন স্কেল—ছিলঅনুরূপ স্কেল স্পষ্টভাবে নির্ধারিত
পে-ফিক্সেশনের নির্দিষ্ট সূত্রছিলছিলবিস্তারিতভাবে রয়েছে
ধাপ না মিললে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ—প্রযোজ্য বিধানআছে
জুনিয়র বেশি বেতন পেলে সিনিয়রের বেতন সমান করার সাধারণ বিধানবিভিন্ন ক্ষেত্রে সমতাকরণ ব্যবস্থা আলোচিত/প্রয়োগযোগ্য ছিলআগের কাঠামো আর বহাল নেইস্বতন্ত্র সাধারণ সমতাকরণ ধারা স্পষ্ট নয়

২০০৯ সালের কাঠামোয় সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলের বাস্তব প্রয়োগের সরকারি উদাহরণও সরকারি গেজেটে পাওয়া যায়।


কর্মচারীদের জন্য এর বাস্তব অর্থ কী?

২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশন শুরু হলে প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান বেতন কত—এটি দেখলেই হবে না। বরং দেখতে হবে—

১. ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কোন স্কেলে ছিলেন
২. ওই স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন কত ছিল
৩. বর্তমান মূল বেতন প্রারম্ভিক বেতনের চেয়ে কত বেশি
৪. ২০২৬ সালের কোন অনুরূপ স্কেল প্রযোজ্য
৫. পার্থক্যটি নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করার পর কোন ধাপে পড়ছে
৬. নির্দিষ্ট ধাপ না থাকলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপ কোনটি
৭. উচ্চতর গ্রেড, পদোন্নতি বা অন্য কোনো কারণে আলাদা বিধান প্রযোজ্য কি না

এভাবে পে-ফিক্সেশন করার পরেই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে। নতুন পে-স্কেলের অনলাইন পে-ফিক্সেশন ব্যবস্থাও অর্থ বিভাগ চালু করেছে/করছে।


সমতাকরণ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

বর্তমান গেজেট বিশ্লেষণে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়:

“জুনিয়র কর্মচারী যদি পে-ফিক্সেশনের পরও সিনিয়রের চেয়ে বেশি মূল বেতন পান, তাহলে সিনিয়র কর্মচারী কি লিখিত আবেদন করে সমতাকরণ দাবি করতে পারবেন?”

এ বিষয়ে ২০২৬ সালের মূল বেতন আদেশে ২০০৯ সালের মতো সরাসরি ও স্বতন্ত্র সাধারণ সমতাকরণ বিধান স্পষ্ট নয়। তাই বর্তমানে এটিকে স্বয়ংক্রিয় অধিকার হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।

তবে পে-ফিক্সেশন বাস্তবায়নের পর যদি এমন বৈষম্যের ব্যাপক ঘটনা দেখা দেয়, তখন অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা বা সংশোধনী আদেশ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা

নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ কর্মচারীদের পুরোনো বেতন থেকে নতুন স্কেলে নেওয়ার জন্য অনুরূপ স্কেল, বেতন পার্থক্য বহন এবং পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণের সুস্পষ্ট পদ্ধতি রাখা হয়েছে।

কিন্তু ২০০৯ সালের মতো “জুনিয়র কর্মচারী সিনিয়রের চেয়ে বেশি বেতন পেলে সিনিয়রের বেতন জুনিয়রের সমান করে দিতে হবে”—এমন আলাদা সাধারণ বেতন সমতাকরণ বিধান ২০২৬ সালের গেজেটে স্পষ্টভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে ২০২৬ সালের পে-ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে “অনুরূপ স্কেল”কে “বেতন সমতাকরণ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বর্তমান গেজেটের ভিত্তিতে সমতাকরণের বিষয়টি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ভবিষ্যৎ অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা/পরিপত্র বা সংশোধনী গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *