পেনশন-আনুতোষিক-ছুটি নগদায়ন—সরকারি কর্মচারীদের অবসর সুবিধায় নতুন নির্দেশনা
সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধা ও পেনশন প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনটি ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এতে পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ভিত্তিতে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার, বিদ্যমান পেনশনভোগীদের নিট পেনশন, আনুতোষিক, অক্ষমতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক সহায়তা, পারিবারিক পেনশন এবং ছুটি নগদায়নসহ একাধিক বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিতে প্রথম পেনশন ৯০ শতাংশ
প্রজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পেনশনযোগ্য চাকরিকাল অনুযায়ী প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার নতুন করে নির্ধারণ। এতে ৫ বছর চাকরিকালের জন্য ২১ শতাংশ থেকে শুরু করে ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব চাকরিকালের জন্য সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাকরিকাল অনুযায়ী হারগুলো হলো—
| পেনশনযোগ্য চাকরিকাল | প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার |
|---|---|
| ৫ বছর | ২১% |
| ৬ বছর | ২৪% |
| ৭ বছর | ২৭% |
| ৮ বছর | ৩০% |
| ৯ বছর | ৩৩% |
| ১০ বছর | ৩৬% |
| ১১ বছর | ৩৯% |
| ১২ বছর | ৪২% |
| ১৩ বছর | ৪৫% |
| ১৪ বছর | ৪৮% |
| ১৫ বছর | ৫১% |
| ১৬ বছর | ৫৪% |
| ১৭ বছর | ৫৭% |
| ১৮ বছর | ৬০% |
| ১৯ বছর | ৬৩% |
| ২০ বছর | ৭২% |
| ২১ বছর | ৭৫% |
| ২২ বছর | ৭৮% |
| ২৩ বছর | ৮১% |
| ২৪ বছর | ৮৭% |
| ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব | ৯০% |
অর্থাৎ, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ২৫ বছর বা তার বেশি হলে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশে পৌঁছাবে। তবে এই হারকে সরাসরি হাতে পাওয়া পেনশনের পরিমাণ হিসেবে দেখা যাবে না; ব্যক্তির প্রযোজ্য মূল বেতন, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল এবং সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী চূড়ান্ত অঙ্ক নির্ধারিত হবে।
চাকরিকাল বাড়লে ধাপে ধাপে বাড়বে পেনশনের হার
প্রজ্ঞাপনের কাঠামোতে দেখা যায়, ৫ থেকে ১৯ বছর পর্যন্ত অধিকাংশ ধাপে প্রতি বছর চাকরিকালের সঙ্গে পেনশন নির্ধারণের হার ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট করে বাড়ানো হয়েছে। ২০ বছর পূর্ণ হলে হার এক ধাপে বেড়ে ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর ২১, ২২, ২৩ ও ২৪ বছরে যথাক্রমে ৭৫, ৭৮, ৮১ ও ৮৭ শতাংশ এবং ২৫ বছর বা তদূর্ধ্বে ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর ফলে অবসরের সময় একজন কর্মচারীর মোট পেনশনযোগ্য চাকরিকাল কত বছর—এটি পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনের ভিত্তিতে নতুন হিসাব
শুধু নতুন অবসরগ্রহণকারীদের জন্য নয়, বিদ্যমান পেনশনভোগীদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণের বিষয়ও প্রজ্ঞাপনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোতে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রাপ্ত নিট পেনশনের পরিমাণকে ভিত্তি ধরে বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
| ৩০ জুন ২০২৬-এ প্রাপ্ত নিট পেনশন | বৃদ্ধির হার |
|---|---|
| সর্বনিম্ন–৯,০০০ টাকা | ১০০% |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% |
| ৪০,০০১ টাকা ও তদূর্ধ্ব | ৫৫% |
প্রজ্ঞাপনের টেবিলে প্রতিটি স্তরের জন্য ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ নিট পেনশনের সীমাও দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ স্তরে পুনর্নির্ধারিত নিট পেনশনের সর্বোচ্চ সীমা ৭০,২০০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
কম পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি
নতুন কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—বর্তমান নিট পেনশন যত কম, নির্ধারিত বৃদ্ধির হার তত বেশি।
উদাহরণ হিসেবে, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সর্বোচ্চ ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া শ্রেণির জন্য বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। অন্যদিকে ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, পেনশনের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে বৃদ্ধির হার সমান রাখা হয়নি; বিদ্যমান নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
আনুতোষিকের হারও নির্ধারিত
প্রজ্ঞাপনে পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ভিত্তিতে আনুতোষিকের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
| পেনশনযোগ্য চাকরিকাল | আনুতোষিকের হার |
|---|---|
| ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১০ বছরের কম | ২৬৫ টাকা |
| ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ১৫ বছরের কম | ২৬৮ টাকা |
| ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব কিন্তু ২০ বছরের কম | ২৭৫ টাকা |
| ২০ বছর বা তদূর্ধ্ব | ২৮০ টাকা |
ফলে ২০ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকালের ক্ষেত্রে আনুতোষিকের হার সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে।
পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যু বা অক্ষমতায় বিশেষ সহায়তা
প্রজ্ঞাপনে এমন কর্মচারীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যারা চাকরি পেনশনযোগ্য হওয়ার আগে স্বাস্থ্যগত কারণে অক্ষম হন অথবা মারা যান।
এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে কর্মচারী বা তার পরিবারকে এককালীন বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়ায় সাধারণ পেনশন সুবিধা না মিললেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার ব্যবস্থা রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে এ ধরনের সহায়তার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চাকরিকাল ও সর্বশেষ বেতনের ভিত্তিতে হিসাব করার বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অর্থের পরিমাণ জানতে সংশ্লিষ্ট বিধি ও চাকরির তথ্য বিবেচনা করতে হবে।
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর পারিবারিক পেনশন
অবসর সুবিধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পারিবারিক পেনশন। প্রজ্ঞাপনে বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর পারিবারিক পেনশন পাওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত শর্ত অনুযায়ী, মৃত পেনশনভোগীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী নির্ধারিত বিধান ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আজীবন পারিবারিক পেনশন পাওয়ার সুযোগ রাখেন। অর্থ বিভাগের পেনশনসংক্রান্ত সরকারি বিধানেও বিধবা স্ত্রীর আজীবন পারিবারিক পেনশনের বিষয়টি পৃথকভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উত্তরাধিকারী সনদ, নন-ম্যারিজ সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের বিধানও অর্থ বিভাগের পেনশন নির্দেশিকায় রয়েছে।
ছুটি নগদায়নে সর্বোচ্চ ১৮ মাস
অবসরকালীন সুবিধার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ছুটি নগদায়ন।
প্রজ্ঞাপনে অবসর-উত্তর ছুটি বা PRL এবং ছুটি নগদায়নের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অর্থ বিভাগের বিদ্যমান পেনশন নির্দেশনাতেও অবসর প্রস্তুতি ছুটি, ছুটি নগদায়ন বা ল্যাম্প গ্রান্ট এবং পেনশন আবেদনের বিষয়গুলো পৃথকভাবে নির্ধারিত রয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর কাঠামো
প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট বিধি, আদেশ ও স্মারক প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন বা সংশোধনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সংশ্লিষ্ট সুবিধা কার্যকরের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ বিভাগ চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬-ও প্রকাশ করেছে। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে এ আদেশের প্রকাশের তারিখ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দেখানো হয়েছে।
কার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
নতুন নির্দেশনাটি কয়েকটি আলাদা শ্রেণির সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীর জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
চাকরিরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে—পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ভবিষ্যৎ প্রথম পেনশন নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে হার ৯০ শতাংশ।
বর্তমান পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে—৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন নতুন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বিদ্যমান পেনশনের স্তর অনুযায়ী ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত বৃদ্ধির হার প্রযোজ্য হবে।
অবসরপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে—আনুতোষিকের হার এবং ছুটি নগদায়নের বিধান গুরুত্বপূর্ণ। ২০ বছর বা তার বেশি পেনশনযোগ্য চাকরিকালে আনুতোষিকের হার ২৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের বিধান রয়েছে।
কর্মচারীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারে—নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে পারিবারিক পেনশন এবং চাকরি পেনশনযোগ্য হওয়ার আগেই মৃত্যু বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিধান কার্যকর হবে।
পেনশন হিসাবের ক্ষেত্রে সতর্কতা
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—৯০ শতাংশকে সরাসরি প্রত্যেক ২৫ বছর চাকরির কর্মচারীর হাতে পাওয়া মাসিক পেনশন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রজ্ঞাপনে এটি প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবে কোনো কর্মচারী কত টাকা পেনশন পাবেন, তা নির্ভর করবে তার প্রযোজ্য মূল বেতন, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল, অবসরের ধরন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিধানের ওপর।
একইভাবে বিদ্যমান পেনশনভোগীর ক্ষেত্রে শুধু বৃদ্ধির হার দিয়ে নতুন পেনশন নির্ধারণ করা যাবে না; ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তার প্রকৃত নিট পেনশন কোন স্তরে ছিল, সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
সব মিলিয়ে ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এই প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক একসঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—
- ২৫ বছর বা তদূর্ধ্ব পেনশনযোগ্য চাকরিকালে প্রথম পেনশন নির্ধারণের হার ৯০%।
- ৫ থেকে ২৪ বছরের চাকরিকালের জন্য ধাপে ধাপে আলাদা হার নির্ধারণ।
- বিদ্যমান পেনশনভোগীদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণে ৫৫% থেকে ১০০% পর্যন্ত বিভিন্ন বৃদ্ধির হার।
- নির্ধারিত কাঠামোয় সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০,২০০ টাকা।
- ২০ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে আনুতোষিকের হার ২৮০ টাকা।
- চাকরি পেনশনযোগ্য হওয়ার আগে মৃত্যু বা অক্ষমতায় নির্ধারিত শর্তে বিশেষ আর্থিক সহায়তা।
- বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর জন্য পারিবারিক পেনশনের বিধান।
- অবসরকালীন ছুটি নগদায়নে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের সুবিধা।
- সংশ্লিষ্ট নতুন সুবিধা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার বিধান।
অর্থ বিভাগের প্রকাশিত নোটিশে বিষয়টিকে সরকারি কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধাদি/প্রাপ্যতা নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত নির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


