হিসাবরক্ষক, সাঁটলিপিকার ও উচ্চমান সহকারীর সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা: কোন নিয়মে হবে তালিকা?
সরকারি দপ্তরে একই উচ্চতর পদে পদোন্নতির সুযোগ থাকা একাধিক ফিডার পদের কর্মচারীদের নিয়ে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড বিবেচনা করলেই হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, ফিডার পদ, সংশ্লিষ্ট পদে যোগদানের তারিখ এবং একই তারিখে নিয়োগ হলে মেধাক্রম—সবকিছু বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষ করে হিসাবরক্ষক ১৩তম গ্রেড, সাঁটলিপিকার ১৩তম গ্রেড এবং উচ্চমান সহকারী ১৪তম গ্রেড—এই তিন পদকে একসঙ্গে নিয়ে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারি নথিপত্র ও প্রচলিত বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো একটি পদের গ্রেড বেশি হলেই সেই পদের কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য পদের কর্মচারীর চেয়ে জ্যেষ্ঠ হয়ে যান—এমন সাধারণ নিয়ম নেই।
জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে প্রথমেই দেখতে হবে ফিডার পদ
সরকারি কর্মচারী (আইন) ২০১৮-এর ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা আপাতত বলবৎ আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। কোনো পদের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সুস্পষ্ট বিধান না থাকলে সরকার উপযুক্ত পদ্ধতিতে তা নির্ধারণ করতে পারে।
অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা, ২০১১ প্রকাশ করেছে, যা এ ধরনের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা।
অর্থাৎ, প্রথম প্রশ্ন হবে—যে উচ্চতর পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে, সেই পদের নিয়োগবিধিতে হিসাবরক্ষক, সাঁটলিপিকার ও উচ্চমান সহকারী—তিনটিই কি ফিডার পদ হিসেবে নির্ধারিত?
যদি তিনটি পদই বৈধ ফিডার পদ হয়, তাহলে তিন পদের কর্মচারীদের নিয়ে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা করার প্রশ্ন আসবে।
শুধু ১৩তম গ্রেড আগে—এমন নিয়ম নেই
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
হিসাবরক্ষক ও সাঁটলিপিকার ১৩তম গ্রেডের এবং উচ্চমান সহকারী ১৪তম গ্রেডের হওয়ায় অনেক সময় ধারণা করা হয়, ১৩তম গ্রেডের সবাইকে আগে রেখে পরে ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীদের রাখতে হবে।
কিন্তু ফিডার পদের সংশ্লিষ্ট চাকরির সময়কাল ও জ্যেষ্ঠতার বিধান বিবেচনা করলে বিষয়টি এত সরল নয়।
সরকারি নথিতে বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বিত গ্রেডেশন তালিকায় ১৩তম ও ১৪তম গ্রেডের একাধিক পদকে একই পদে পদোন্নতির ফিডার পদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নজির রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি সাম্প্রতিক সরকারি নথিতে ১৩তম গ্রেডের বিভিন্ন পদ এবং ১৪তম গ্রেডের উচ্চমান সহকারীসহ একাধিক পদকে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদের ফিডার পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও বিভিন্ন ফিডার পদের কর্মচারীদের নিয়ে সমন্বিত খসড়া গ্রেডেশন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ২০১১ সালের নন-ক্যাডার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালার উল্লেখ করেছে।
তাহলে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তি কী?
সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈধভাবে গণনাযোগ্য জ্যেষ্ঠতার তারিখ।
বিশেষ করে একই পদে যোগদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদে যোগদানের তারিখ গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিধানভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের একটি উদাহরণে বলা হয়েছে—
- সংশ্লিষ্ট পদে যোগদানের তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা গণনা;
- একই সময়ে একাধিক ব্যক্তি নিয়োগ পেলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মেধাতালিকা অনুযায়ী পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা;
- পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদোন্নতির আদেশের তারিখ বা আদেশে নির্ধারিত তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা;
- একই সময়ে একাধিক ব্যক্তির পদোন্নতি হলে পূর্ববর্তী পদে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ক্রম নির্ধারণ;
- একই তারিখের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে জন্মতারিখও বিবেচনা করা যায়।
তাই মূল পদে যোগদানের তারিখ, ফিডার পদে যোগদানের তারিখ এবং পদোন্নতির ইতিহাস—এসব তথ্য যাচাই না করে শুধু গ্রেডের ভিত্তিতে তালিকা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার
ধরা যাক—
| কর্মচারী | পদ | গ্রেড | সংশ্লিষ্ট ফিডার পদে যোগদান |
|---|---|---|---|
| ক | হিসাবরক্ষক | ১৩ | ০১ জানুয়ারি ২০১৮ |
| খ | সাঁটলিপিকার | ১৩ | ০১ জুন ২০১৯ |
| গ | উচ্চমান সহকারী | ১৪ | ০১ জানুয়ারি ২০১৬ |
যদি তিনটি পদই একই উচ্চতর পদের বৈধ ফিডার পদ হয় এবং সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধিতে ভিন্ন কোনো অগ্রাধিকার নির্ধারিত না থাকে, তাহলে শুধু এই কারণে যে ক ও খ ১৩তম গ্রেডে এবং গ ১৪তম গ্রেডে—ক ও খ-কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ-এর ওপরে বসানো যাবে না।
বরং প্রযোজ্য বিধি অনুসারে গণনাযোগ্য জ্যেষ্ঠতার তারিখ বিবেচনা করতে হবে।
এই উদাহরণে উচ্চমান সহকারী হিসেবে গ-এর সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠতার তারিখ যদি ২০১৬ সাল থেকে গণনাযোগ্য হয়, তাহলে তার অবস্থান আগে আসতে পারে।
একই গ্রেড হলেও আবার আলাদা নিয়ম
হিসাবরক্ষক ও সাঁটলিপিকার দুটিই যদি ১৩তম গ্রেডের হয়, তাহলেও তাদের মধ্যে কে আগে—তা শুধু গ্রেড দেখে নির্ধারণ করা যাবে না।
ধরা যাক—
হিসাবরক্ষক: ২০১৭ সালে সংশ্লিষ্ট পদে যোগদান
সাঁটলিপিকার: ২০১৫ সালে সংশ্লিষ্ট পদে যোগদান
যদি উভয় পদই একই উচ্চতর পদের ফিডার পদ এবং অন্য কোনো বিশেষ বিধান না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠতার তারিখ যাচাই করে সাঁটলিপিকার আগে আসতে পারেন।
অর্থাৎ—
গ্রেড ≠ স্বয়ংক্রিয় জ্যেষ্ঠতা।
সরকারি নথিতেও এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি সরকারি গ্রেডেশন নথিতে সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পদে পদোন্নতির জন্য ১৩তম গ্রেডের একাধিক ফিডার পদ এবং ১৪তম গ্রেডের উচ্চমান সহকারীসহ বিভিন্ন পদকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০২৪ সালে সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী/উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক এবং সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটরদের নিয়ে সমন্বিত খসড়া গ্রেডেশন তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। সেখানে নন-ক্যাডার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০১১-এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিশেষ বিধিমালার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট পদগুলোর ফিডার সম্পর্ক এবং প্রযোজ্য নিয়োগবিধি নির্ধারণ করা অপরিহার্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: নিয়োগবিধি আগে, গ্রেড পরে
কোনো দপ্তরে যদি উচ্চতর পদের নিয়োগবিধিতে বলা থাকে যে—
“উচ্চমান সহকারী ও সাঁটলিপিকার পদ থেকে পদোন্নতি হবে”
তাহলে সেখানে হিসাবরক্ষককে শুধু ১৩তম গ্রেড হওয়ার কারণে একই ফিডার তালিকায় ঢোকানো যাবে না, যদি না সংশ্লিষ্ট বিধিতে হিসাবরক্ষককেও ফিডার পদ হিসেবে রাখা হয়।
একইভাবে, কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগবিধিতে যদি হিসাবরক্ষক, সাঁটলিপিকার ও উচ্চমান সহকারী—তিনটিকেই ফিডার পদ হিসেবে উল্লেখ করা থাকে, তাহলে তিন পদের কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের প্রশ্ন আসবে।
সুতরাং প্রথমে ফিডার পদ নির্ধারণ, এরপর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ—এটাই মূল কাঠামো।
জ্যেষ্ঠতা তালিকা তৈরির সম্ভাব্য কাঠামো
একটি সঠিক সমন্বিত গ্রেডেশন তালিকায় সাধারণত অন্তত এসব তথ্য রাখা উচিত—
১. ক্রমিক নম্বর
২. কর্মচারীর নাম
৩. বর্তমান পদ
৪. গ্রেড
৫. মূল পদে প্রথম নিয়োগের তারিখ
৬. সংশ্লিষ্ট ফিডার পদে যোগদানের তারিখ
৭. নিয়োগের ধরন—সরাসরি/পদোন্নতি
৮. মেধাক্রম, যেখানে প্রযোজ্য
৯. পদোন্নতির তারিখ
১০. শিক্ষাগত যোগ্যতা
১১. জন্মতারিখ
১২. সংশ্লিষ্ট উচ্চতর পদে পদোন্নতির যোগ্যতার তারিখ
১৩. মন্তব্য
এভাবে তথ্য সাজালে কে কোন ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠ—তা যাচাই করা সহজ হয়।
আপত্তি থাকলে খসড়া তালিকাই গুরুত্বপূর্ণ
কোনো দপ্তর সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের উচিত নিজের—
- নিয়োগপত্র,
- যোগদানপত্র,
- ফিডার পদে পদায়ন/পদোন্নতির আদেশ,
- চাকরির ধারাবাহিকতার তথ্য,
- মেধাক্রম,
- পূর্বের জ্যেষ্ঠতা তালিকা
যাচাই করা।
ভুল ক্রম থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আপত্তি/অভিযোগ দাখিল করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তীতে ওই জ্যেষ্ঠতা তালিকার ভিত্তিতেই পদোন্নতির জন্য কর্মচারীদের বিবেচনা করা হতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি অফিস আদেশেও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী (জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি) বিধিমালা-২০১১-এর বিধি ৪ ও ৯ অনুসরণ করে প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী ও সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরতদের খসড়া জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রস্তুতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা
হিসাবরক্ষক ১৩তম গ্রেড, সাঁটলিপিকার ১৩তম গ্রেড এবং উচ্চমান সহকারী ১৪তম গ্রেড—এই তিন পদের সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে “১৩তম গ্রেড আগে, ১৪তম গ্রেড পরে”—এমন সরল সূত্র প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ধারাবাহিকভাবে দেখতে হবে—
প্রথমত: সংশ্লিষ্ট উচ্চতর পদের নিয়োগবিধি কী বলছে।
দ্বিতীয়ত: তিনটি পদই ওই পদের বৈধ ফিডার পদ কি না।
তৃতীয়ত: প্রত্যেকের সংশ্লিষ্ট ফিডার পদে গণনাযোগ্য জ্যেষ্ঠতার তারিখ।
চতুর্থত: একই তারিখ হলে মেধাক্রম/অন্যান্য বিধিসম্মত মানদণ্ড।
পঞ্চমত: কোনো বিশেষ নিয়োগবিধি বা সরকারি আদেশ সাধারণ বিধানের ওপর প্রযোজ্য কি না।
অতএব, গ্রেড নয়—প্রযোজ্য নিয়োগবিধি ও বৈধ ফিডার পদে অর্জিত জ্যেষ্ঠতাই সমন্বিত তালিকার মূল ভিত্তি। তবে নির্দিষ্ট দপ্তরের নিয়োগবিধি না দেখে তিন পদের মধ্যে চূড়ান্ত ক্রম নির্ধারণ করা যাবে না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাস্তবে কোন কর্মচারী কার ওপরে থাকবেন, সেটি নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চতর পদটির নাম ও নিয়োগবিধি জানা সবচেয়ে জরুরি।



