পে ফিক্সেশন প্রক্রিয়া ২০২৬: সরকারি কর্মচারীদের নিজেকেই অনলাইনে বেতন নির্ধারণ করতে হবে
নবম জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে প্রচলিত কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে iBAS++ সিস্টেমের মাধ্যমে অনলাইনে পে ফিক্সেশন করতে হবে। অর্থাৎ, সরকারি কর্মচারীদের নিজেদের বেতন নির্ধারণের জন্য অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করে আবেদন/তথ্য দাখিল করতে হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি কর্মচারীর একক সিদ্ধান্তে শেষ হবে না; পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট DDO ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যাচাই ও প্রতিপাদন থাকবে।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর অনলাইনে বেতন নির্ধারণের এই পদ্ধতি নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে অনলাইন পে ফিক্সেশনের জন্য কারা কীভাবে iBAS++-এ প্রবেশ করবেন, কোন তথ্য দিতে হবে এবং তথ্য জমা দেওয়ার পর কীভাবে তা যাচাই হবে—এসব বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিজেকেই কি পে ফিক্সেশন করতে হবে?
হ্যাঁ। নতুন নিয়মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারি কর্মচারীকে নিজের বেতন নির্ধারণের জন্য iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে গিয়ে নির্ধারিত ছক পূরণ করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ জারির পর সরকারি কর্মচারীরা iBAS++-এ লগইন করে Pay Fixation অপশনে গিয়ে নিজেদের বেতন নির্ধারণের জন্য নির্ধারিত তথ্য পূরণ করবেন। পুরোনো payfixation.gov.bd ওয়েবসাইট দিয়ে প্রবেশ করলেও সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে iBAS++-এর Pay Fixation অপশনে নিয়ে যাবে।
অর্থাৎ, “অফিসের হিসাবরক্ষক সবার হয়ে পে ফিক্সেশন করে দেবেন”—এমন ব্যবস্থা নয়। কর্মচারী নিজে তথ্য দেবেন এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কর্মচারী একাই পুরো পে ফিক্সেশন চূড়ান্ত করবেন। কর্মচারীর তথ্য দাখিলের পর DDO এবং হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যাচাই ও প্রতিপাদনের ধাপ রয়েছে।
গেজেটেড ও নন-গেজেটেড কর্মচারীর লগইন পদ্ধতি আলাদা
পে ফিক্সেশনের জন্য iBAS++-এ প্রবেশের ক্ষেত্রেও দুই ধরনের কর্মচারীর জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গেজেটেড কর্মকর্তা
গেজেটেড সরকারি কর্মচারীকে তাঁর iBAS++ Login User ID এবং Password ব্যবহার করে সিস্টেমে প্রবেশ করতে হবে।
নন-গেজেটেড কর্মচারী
নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারী জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) নম্বর এবং জন্মতারিখ ব্যবহার করে iBAS++-এ প্রবেশ করবেন।
লগইনের সময় iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে পাঠানো OTP (One-Time Password) ব্যবহার করতে হবে। দেশের বাইরে অবস্থানরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ই-মেইলে OTP পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
NID না থাকলে কী করতে হবে?
পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কোনো সরকারি কর্মচারীর NID না থাকলে আগে NID-এর জন্য নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে।
আবার NID-তে থাকা জন্মতারিখের সঙ্গে চাকরির রেকর্ডে থাকা জন্মতারিখের মিল না থাকলেও সমস্যা হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য সংশোধন/সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।
তাই পে ফিক্সেশন শুরু করার আগে কর্মচারীদের NID, জন্মতারিখ ও চাকরির রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কোন তথ্যের প্রয়োজন হতে পারে?
অনলাইন পে ফিক্সেশনে কর্মচারীর চাকরি ও বর্তমান বেতনের বিভিন্ন তথ্য প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- বর্তমান পদ ও গ্রেড
- বর্তমান মূল বেতন
- চাকরিতে যোগদানের তথ্য
- পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য
- বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট
- পদোন্নতির তথ্য
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
- চাকরির অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য
নতুন পে-স্কেলের বেতন নির্ধারণে পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনের তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব তথ্যের ভিত্তিতেই নতুন মূল বেতন নির্ধারণ হবে।
তথ্য পূরণ করার পর নতুন মূল বেতন দেখাবে সিস্টেম
পে ফিক্সেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, কর্মচারী নির্ধারিত ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করার পর নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ সিস্টেমে প্রদর্শিত হবে।
অর্থাৎ কর্মচারী শুধু নিজের তথ্য জমা দেবেন না; তথ্য ইনপুটের পর নতুন কাঠামোয় তাঁর মূল বেতন কত নির্ধারিত হচ্ছে, সেটিও অনলাইন ব্যবস্থায় দেখা যাবে।
এর ফলে হাতে-কলমে হিসাবের পাশাপাশি কর্মচারী নিজেও তাঁর নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাব সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত ছকে তথ্য সঠিকভাবে এন্ট্রি করার পর DDO বরাবর সাবমিশনের আগেই নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নির্ধারণযোগ্য মূল বেতনের পরিমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হবে।
এরপর কী করবেন কর্মচারী?
পে ফিক্সেশনের প্রাথমিক অংশটি সম্পন্ন করার পর কর্মচারীকে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তথ্য DDO-এর কাছে সাবমিট করতে হবে।
এখানেই কর্মচারীর নিজস্ব কাজ শেষ হওয়ার পর সরকারি দপ্তরের যাচাই প্রক্রিয়া শুরু হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে
কর্মচারী iBAS++-এ লগইন করবেন
↓
Pay Fixation অপশনে যাবেন
↓
নির্ধারিত ছক পূরণ করবেন
↓
চাকরি ও পূর্ববর্তী বেতনের তথ্য দেবেন
↓
সিস্টেম নতুন নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন দেখাবে
↓
তথ্য DDO-এর কাছে সাবমিট করবেন
↓
DDO তথ্য যাচাই করবেন
↓
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র/বেতন নির্ধারণী বিবরণী হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানো হবে
↓
হিসাবরক্ষণ অফিস যাচাই ও প্রতিপাদন করবে
↓
চূড়ান্তভাবে প্রতিপাদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণের ভিত্তিতে নতুন বেতন পরিশোধ করা হবে।
DDO-এর দায়িত্ব কী?
পে ফিক্সেশন শুধু কর্মচারীর তথ্য দেওয়ার মধ্যেই শেষ হচ্ছে না। Drawing and Disbursing Officer বা DDO-এরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, গেজেটেড কর্মচারীর বেতন নির্ধারণী বিবরণী DDO হিসাবরক্ষণ অফিসে ফরওয়ার্ড করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীর ক্ষেত্রে সার্ভিস বই অনুযায়ী পূর্ববর্তী চাকরি ও বেতনের তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা নিশ্চিত করে DDO তা হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠাবেন। iBAS++ থেকে বেতন নির্ধারণী বিবরণের কপিও প্রয়োজনীয় নথির সঙ্গে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
ফলে কর্মচারী নিজে অনলাইনে পে ফিক্সেশন করলেও চূড়ান্ত যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অফিস ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার ওপর থাকবে।
ভুল তথ্য দিলে কী হবে?
এখানে কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পে ফিক্সেশনে তথ্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য ভুল হলে নতুন বেতন নির্ধারণেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে অনলাইনে নির্ধারিত বেতনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ভুল ধরা পড়লে বিষয়টি সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রতিপাদনের পর কোনো কর্মচারীকে ভুলক্রমে কম বা বেশি বেতন দেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে তা সমন্বয় করা যেতে পারে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে পে ফিক্সেশন
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। সরকার ১৯ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করেছে এবং নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) জানিয়েছে, ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর হলেও সংশোধিত মূল বেতন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৫০ শতাংশ যোগ করার বিধান রয়েছে।
এ কারণে পে ফিক্সেশনের সময় শুধু নতুন বেতনস্কেলের টেবিল দেখলেই হবে না; প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নের নিয়মও বিবেচনায় নিতে হবে।
কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি
অনলাইন পে ফিক্সেশন শুরু করার আগে সরকারি কর্মচারীদের কয়েকটি বিষয় প্রস্তুত রাখা ভালো—
১. NID-এর তথ্য যাচাই করুন
নাম ও জন্মতারিখ সঠিক আছে কি না দেখে নিন।
২. iBAS++-এ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর সচল রাখুন
কারণ OTP প্রয়োজন হবে।
৩. ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের মূল বেতনের তথ্য যাচাই করুন।
৪. সর্বশেষ ইনক্রিমেন্টের তথ্য মিলিয়ে নিন।
৫. পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড হয়ে থাকলে তার তথ্য যাচাই করুন।
৬. পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য হাতে রাখুন।
৭. সার্ভিস বই/চাকরির রেকর্ডের সঙ্গে অনলাইনে দেওয়া তথ্য মিলিয়ে নিন।
৮. তথ্য সাবমিট করার আগে নতুন নির্ধারণযোগ্য মূল বেতন ভালোভাবে পরীক্ষা করুন।
তাহলে মূল কথা কী?
নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬-এর অনলাইন পে ফিক্সেশন হবে কর্মচারী-কেন্দ্রিক, কিন্তু চূড়ান্তভাবে কর্তৃপক্ষ-যাচাইকৃত একটি প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ—
পে ফিক্সেশনের তথ্য কর্মচারী নিজে অনলাইনে পূরণ করবেন; DDO ও হিসাবরক্ষণ অফিস পরবর্তী যাচাই ও প্রতিপাদনের কাজ করবে।
তাই সরকারি কর্মচারীদের এখন থেকেই নিজেদের NID, iBAS++ নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, বর্তমান মূল বেতন, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের তথ্য প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজে পে ফিক্সেশন করা মানে নিজের বেতন নিজে চূড়ান্ত করে ফেলা নয়। কর্মচারী অনলাইনে তথ্য প্রদান ও সাবমিশন করবেন; এরপর DDO এবং হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের যাচাই ও প্রতিপাদনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। চূড়ান্তভাবে প্রতিপাদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বেতন পরিশোধ করবে।
সংক্ষেপে
| বিষয় | কী হবে |
|---|---|
| পে ফিক্সেশন | অনলাইনে |
| প্ল্যাটফর্ম | iBAS++ Pay Fixation |
| তথ্য পূরণ | কর্মচারী নিজে |
| গেজেটেড লগইন | iBAS++ User ID + Password |
| নন-গেজেটেড লগইন | NID + জন্মতারিখ |
| OTP | নিবন্ধিত মোবাইলে |
| নতুন মূল বেতন | সিস্টেমে প্রদর্শিত হবে |
| পরবর্তী যাচাই | DDO |
| চূড়ান্ত প্রতিপাদন | হিসাবরক্ষণ অফিস |
| বেতন প্রদান | প্রতিপাদিত বেতন নির্ধারণী বিবরণের ভিত্তিতে |
সুতরাং ২০২৬ সালের পে ফিক্সেশনে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—নিজের বেতন নির্ধারণের তথ্য অনলাইনে নিজেকেই পূরণ করতে হবে; তবে চূড়ান্ত অনুমোদন/প্রতিপাদন প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমেই সম্পন্ন হবে।


