নির্বাচনের আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার সম্ভাবনা নেই: গভর্নর
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন কোনো পে স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে বরিশালের একটি স্থানীয় হোটেলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় গভর্নর এই তথ্য জানান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় ষাণ্মাসিকের মুদ্রানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে এ সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
গভর্নরের বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো:
-
নির্বাচনকেন্দ্রিক মনোযোগ: গভর্নর জানান, এক মাস পরেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ কারণে সরকারের সমস্ত মনোযোগ এখন নির্বাচন কেন্দ্রিক।
-
কাঠামো তৈরি: অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো একটি বেতন কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যেতে পারে, তবে এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর।
-
যৌক্তিকতা: নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে বড় কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেওয়াকে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে যুক্তিযুক্ত মনে করছেন না।
পে কমিশনের প্রস্তাবনা:
এদিকে, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত পে কমিশনের বৈঠক থেকে জানা গেছে, নবম পে স্কেলের জন্য তিনটি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবনাগুলো হলো:
-
প্রথম প্রস্তাব: সর্বনিম্ন বেতন ২১ হাজার টাকা।
-
দ্বিতীয় প্রস্তাব: সর্বনিম্ন বেতন ১৭ হাজার টাকা।
-
তৃতীয় প্রস্তাব: সর্বনিম্ন বেতন ১৬ হাজার টাকা।
যদিও কমিশনের একটি অংশ ২০টি গ্রেড কমিয়ে ১৬টি করার সুপারিশ করেছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এর আগে গুঞ্জন উঠেছিল যে, বেতন সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, তবে গভর্নর এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে বড় কোনো আর্থিক ব্যয়ভার নির্বাচনের আগে নেওয়ার ব্যাপারে সংযত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ক্যাশলেস লেনদেন ও আমদানি নীতি:
মতবিনিময় সভায় গভর্নর ক্যাশলেস লেনদেনের ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, “নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে কিউআর কোড (QR Code) বাধ্যতামূলক করা হলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়বে এবং বাজারে ছেঁড়া-ফাটা নোটের সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে।” এছাড়া তিনি দেশের জটিল আমদানি নীতির সমালোচনা করে বলেন, কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে পণ্য আমদানিতে দেরি হয়, যার ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতীক্ষায় থাকা কর্মচারীদের আশার আলো কি নিভে গেল?
দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা সরকারি কর্মচারীদের জন্য গভর্নরের এই বক্তব্য কিছুটা হতাশাজনক মনে হলেও, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি; বরং তা কিছুটা প্রলম্বিত হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টি যেভাবে দেখা যেতে পারে:
কেন এটি পুরোপুরি হতাশা নয়?
-
কাঠামো তৈরির কাজ চলমান: গভর্নর জানিয়েছেন যে, বর্তমান সরকার একটি বেতন কাঠামো তৈরি করে দিয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হলো, পে কমিশনের কাজ থেমে নেই। ভিত্তিটি তৈরি থাকলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য এটি বাস্তবায়ন করা অনেক সহজ হবে।
-
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি: যেহেতু নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এই আলোচনাগুলো হচ্ছে, তাই পরবর্তী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সরকারি বিশাল এই ভোট ব্যাংককে সন্তুষ্ট রাখতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বা এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
-
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান: দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে বেতন বাড়ানো এখন বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তা। নীতিনির্ধারকরাও জানেন যে বিদ্যমান বেতন কাঠামো দিয়ে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
যেখানে শঙ্কার জায়গা:
-
সময়ক্ষেপণ: কর্মচারীদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচনের আগেই হয়তো কোনো সুসংবাদ আসবে। গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, সরাসরি পকেটে টাকা আসতে আরও কয়েক মাস বা নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
-
অর্থনৈতিক চাপ: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপের কারণে সরকার বড় কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা নিতে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছে।
সারসংক্ষেপ
একে “আশার আলো নিভে যাওয়া” না বলে “অপেক্ষা দীর্ঘ হওয়া” বলাই শ্রেয়। পে কমিশনের প্রস্তাবিত ১৬, ১৭ বা ২১ হাজার টাকার সর্বনিম্ন বেতনের বিষয়টি যেহেতু আলোচনায় আছে, তাই এটি একদম বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।


