প্রথম ধাপে বেতন কম পেলেও হতাশার কারণ নেই? ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে বাড়তে পারে সরকারি কর্মচারীদের বেতন
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকরের পর প্রথম ধাপে প্রত্যাশার তুলনায় কম বেতন হাতে পেয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা একসঙ্গে পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন পে স্কেলে বেতন বৃদ্ধির সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পুরো বিষয়টি শুধু প্রথম ধাপের বেতন দিয়ে বিচার না করে পরবর্তী ধাপের সম্ভাব্য সুবিধার সঙ্গে তুলনা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রচারিত একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হওয়ার পরও দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭৫ শতাংশ হারে বেতন নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় এলে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের প্রাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও এই হিসাবের বাস্তব প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন ও চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের বিধানের ওপর নির্ভরশীল।
প্রথম ধাপের বেতন ও দ্বিতীয় ধাপের হিসাব
বিষয়টি বোঝার জন্য ৮,২৫০ টাকা পুরোনো মূল বেতনের একটি উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রচলিত অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ৮,২৫০ টাকা। নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
এখানে নতুন মূল বেতন এবং পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য হচ্ছে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ প্রথম ধাপে কার্যকর হয়েছে। অর্থাৎ ৫,৮৭৫ টাকা বৃদ্ধির অংশ পুরোনো মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ভিত্তিতে প্রাথমিক হিসাব দাঁড়ায় ১৪ হাজার ১২৫ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ কার্যকর হলে হিসাব দাঁড়াবে:
পুরোনো মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা।
নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্য: ১১,৭৫০ টাকা।
বর্ধিত অংশের ৭৫ শতাংশ: ৮,৮১২.৫০ টাকা।
পুরোনো মূল বেতনসহ মোট মূল বেতন: ১৭,০৬২.৫০ টাকা।
অর্থাৎ, ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হওয়ার পর মূল বেতন ১৫ হাজার টাকা হবে—এমন সরল হিসাবের পরিবর্তে প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত বৃদ্ধির পার্থক্যভিত্তিক হিসাব বিবেচনা করতে হবে। চূড়ান্ত অঙ্ক বেতন নির্ধারণের নিয়ম ও প্রযোজ্য ধাপ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ পাবেন। কিন্তু প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশ। ফলে সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য একই শতাংশ প্রযোজ্য নয়।
News Flash+2
কেন প্রথম ধাপের বেতন দেখে হতাশ হওয়া ঠিক হবে না?
জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার একবারে পুরো বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে প্রথম পর্যায়ে অনেক কর্মচারী প্রত্যাশার তুলনায় কম টাকা হাতে পাচ্ছেন।
কিন্তু এই কম প্রাপ্তিকে নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত আর্থিক সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। কারণ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোতে বর্ধিত মূল বেতনের অংশ আরও বাড়বে।
এ ছাড়া বিদ্যমান ভাতাগুলোও ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগের হারে বহাল রাখার বিধান রয়েছে। নতুন কাঠামোর সংশোধিত ভাতার হার কার্যকর হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। অর্থাৎ মূল বেতনের সুবিধা ধাপে ধাপে বাড়লেও ভাতার পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
News Flash+1
২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ বেতন কার্যকর
নতুন বেতন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বর্ধিত মূল বেতনের শতভাগ কার্যকর হওয়ার কথা। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তখন পূর্ণাঙ্গ মূল বেতন কাঠামোয় পৌঁছাবে।
এতে কর্মচারীরা নতুন বেতন স্কেলের পূর্ণ মূল বেতন এবং প্রযোজ্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। তবে নতুন হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সংশোধিত ভাতা কার্যকর হওয়ার নির্ধারিত সময় ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি।
News Flash+1
৮,২৫০ টাকা বনাম ২০ হাজার টাকা: যে বিষয়টি বুঝতে হবে
অনেক কর্মচারী বলছেন, আগের বেতন কাঠামোয় ৮,২৫০ টাকা মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা যোগ করে সর্বমোট প্রায় ১৫,৪০০ টাকা পেতেন। নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর হওয়ায় তাঁদের হাতে পাওয়া অর্থ নিয়ে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে বিবেচনা করলে চিত্রটি ভিন্ন। কারণ নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেই বর্ধিত বেতনের সুবিধা ৭৫ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে ১০০ শতাংশ কার্যকর হবে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—২০ হাজার টাকার ৭৫ শতাংশ সরাসরি ১৫ হাজার টাকা মূল বেতন হয়ে যাবে, এমনটি প্রজ্ঞাপনের হিসাব নয়। পুরোনো মূল বেতনের সঙ্গে নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের নির্ধারিত অংশ যোগ করেই বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের এখন কী করা উচিত?
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে হতাশা বা আনন্দ প্রকাশের আগে প্রত্যেক কর্মচারীর নিজের গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, নতুন নির্ধারিত মূল বেতন এবং প্রাপ্য ভাতার হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে যাঁরা প্রথম ধাপে প্রত্যাশার তুলনায় কম টাকা পেয়েছেন, তাঁদের উচিত পরবর্তী ধাপের সুবিধা এবং ২০২৮ সাল থেকে সংশোধিত ভাতা কার্যকরের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া।
পাশাপাশি পে-ফিক্সেশনে কোনো ভুল, গ্রেডের অসংগতি কিংবা ভাতা নির্ধারণে সমস্যা থাকলে সংশ্লিষ্ট ডিডিও ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
শেষ কথা
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর সুবিধা একদিনে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। এটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই প্রথম ধাপে হাতে পাওয়া টাকার সঙ্গে আগের মোট বেতনের তুলনা করেই নতুন পে স্কেলের সামগ্রিক সুবিধা বিচার করা যথাযথ হবে না।
যাঁরা প্রথম ধাপের ৫০ শতাংশ সুবিধা পেয়ে হতাশ হচ্ছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে—১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ এবং ১ জুলাই থেকে শতভাগ কার্যকরের সময়সূচি রয়েছে। আর সংশোধিত ভাতার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত।
অতএব, প্রথম ধাপের প্রাপ্তি নয়, বরং পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং নিজের প্রকৃত বেতন নির্ধারণের হিসাব বিবেচনা করেই নতুন পে স্কেলের আর্থিক সুবিধা মূল্যায়ন করা উচিত।



