নবম পে-স্কেলে ৭ বড় পরিবর্তন: বাড়ছে মূল বেতন, বদলাচ্ছে ইনক্রিমেন্ট ও ভাতার হিসাব
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত/অনুমোদিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ ঘিরে মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়মেও বড় পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ ও উচ্চতর গ্রেডের ইনক্রিমেন্টের হারেও পরিবর্তন আসছে।
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু বেসিক বেতন বাড়লেই একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে পাওয়া মোট অর্থ একই অনুপাতে বাড়বে না। কারণ বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া, ইনক্রিমেন্ট এবং কয়েকটি বিদ্যমান সুবিধার হিসাবও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে নতুন পে-স্কেলে ‘মূল বেতন কত বাড়ল’ এবং ‘মোট বেতন-ভাতা কত দাঁড়াল’—দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
১. মূল বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হচ্ছে মূল বেতনে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হচ্ছে এবং গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, নবম গ্রেডের বর্তমান প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা হচ্ছে। দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা এবং দ্বাদশ গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২২ হাজার টাকা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা করার তথ্যও এসেছে।
অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় অনেক গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন কার্যত দ্বিগুণ হচ্ছে। তবে এই বর্ধিত মূল বেতন একদিনে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
২. উচ্চতর গ্রেডে কমবে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার। বর্তমান কাঠামোয় সব গ্রেডে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা থাকলেও নতুন কাঠামোয় গ্রেডভেদে আলাদা হার নির্ধারণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী—
- ২০তম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেড: ৫ শতাংশ
- ৫ম গ্রেড: ৪ শতাংশ
- ৪র্থ ও ৩য় গ্রেড: ৩.৫ শতাংশ
- ২য় গ্রেড: ২.৭৫ শতাংশ
অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকলেও উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার কমবে।
এর ফলে নতুন পে-স্কেলে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর শুরুতে মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ভবিষ্যতে প্রতি বছর বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক গ্রেডভেদে ভিন্ন হবে।
৩. বাড়িভাড়া ভাতার হার কমলেও টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে
নতুন পে-স্কেলের অন্যতম আলোচিত পরিবর্তন হচ্ছে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমানো। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এটি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে নামানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
একইভাবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বাড়িভাড়ার হারও কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
তবে শতাংশ কমলেও বাস্তবে পাওয়া বাড়িভাড়ার টাকা সব ক্ষেত্রে কমবে—এমন নয়। কারণ বাড়িভাড়া হিসাব করা হবে নতুন ও অনেক বেশি মূল বেতনের ওপর। ফলে শতাংশের হিসাবে হার কমলেও মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার কারণে বাড়িভাড়ার প্রকৃত টাকার অঙ্ক অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বাড়তে পারে।
৪. চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতায় পরিবর্তন
নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাতেও পরিবর্তনের তথ্য এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত করার তথ্য রয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয়—
- ৫০ বছর পর্যন্ত: ৩,০০০ টাকা
- ৫০ থেকে ৬০ বছর: ৪,০০০ টাকা
- ৬০ থেকে ৭০ বছর: ৫,০০০ টাকা
- ৭০ বছরের বেশি: ৬,০০০ টাকা
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা চালুর তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে, সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এ সুবিধা প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা ও ধোলাই ভাতাতেও বৃদ্ধির তথ্য এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে যাতায়াত ভাতা ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা করার কথা উল্লেখ রয়েছে।
৫. প্রথমবার সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতা চালুর উদ্যোগ।
বর্তমানে নির্দিষ্ট কয়েকটি উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তা মোবাইল ফোন বিল সুবিধা পেলেও নতুন কাঠামোয় অন্যান্য গ্রেডকেও এর আওতায় আনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—
- ১ম–৫ম গ্রেড: মাসে ৫০০ টাকা
- ৬ষ্ঠ–২০তম গ্রেড: মাসে ১৫০ টাকা
অর্থাৎ নতুন কাঠামো কার্যকর হলে মোবাইল ভাতা একটি ব্যাপকভিত্তিক সুবিধায় পরিণত হতে পারে।
৬. উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমায় পরিবর্তন
নতুন কাঠামোয় শুধু বেতন নয়, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা নিয়েও পরিবর্তনের তথ্য সামনে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা ১০ বছর থেকে ৮ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন একই পদ বা গ্রেডে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্যারিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বাস্তবে কোন পদে, কী শর্তে এবং কোন পর্যায়ে এটি কার্যকর হবে—তা চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিধানেই স্পষ্ট হবে।
৭. ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা বাতিলের তথ্য
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বর্তমানে চালু থাকা বিশেষ প্রণোদনা/বিশেষ সুবিধা আর থাকবে না—এমন তথ্যও প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে। ২০২৪ সালে এই সুবিধা চালু হয় এবং পরে তা মূল বেতনের ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে এটি বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে।
এ কারণে শুধু নতুন মূল বেতন দেখে প্রকৃত আয় বৃদ্ধির হিসাব করা ঠিক হবে না। একজন চাকরিজীবীর বর্তমান মোট আয় থেকে বিশেষ প্রণোদনা বাদ যাবে, অন্যদিকে নতুন মূল বেতন ও সংশোধিত বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হবে। ফলে বর্তমান মোট বেতন বনাম নতুন মোট বেতন তুলনা করলেই প্রকৃত আর্থিক পরিবর্তন বোঝা যাবে।
বেতন কি একবারে বাড়বে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই ২০২৬ থেকে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ, পরবর্তী ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন বাড়িভাড়াসহ বিভিন্ন ভাতা পরবর্তী ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন ভাতাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল শুধু মূল বেতন বাড়ানোর একটি উদ্যোগ নয়; বরং এটি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার পুরো কাঠামোতে পরিবর্তন আনার একটি বড় সংস্কার। একদিকে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে, চিকিৎসা ও মোবাইলসহ কয়েকটি সুবিধা বাড়ছে; অন্যদিকে বাড়িভাড়ার শতাংশ ও উচ্চতর গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার কমছে এবং বিশেষ প্রণোদনা বাতিলের তথ্য রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রজ্ঞাপনে চূড়ান্ত ভাষা ও কার্যকর তারিখই হবে বাস্তব হিসাবের ভিত্তি। বর্তমানে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে তথ্যগুলো এসেছে, সেগুলোর কিছু এখনো প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে থাকার খবরও প্রকাশিত হয়েছে এবং আজ গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনার কথা কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অতএব, নতুন পে-স্কেলে একজন চাকরিজীবী প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বেশি পাবেন—তা নির্ধারণে শুধু মূল বেতন নয়; ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, অন্যান্য ভাতা এবং ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাতিল—সবকিছু একসঙ্গে হিসাব করতে হবে।



