১১ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা: জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন ৯ম পে-স্কেল নিয়ে আর কত টালবাহানা?
২০১৫ সালের সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার পর দেখতে দেখতে দীর্ঘ ১১টি বছর পার হয়ে গেছে। এই এক দশকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও সাধারণ চাকুরিজীবীদের জীবনযাত্রার মানে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বাজারমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি যেখানে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি ‘৯ম পে-স্কেল’ বাস্তবায়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বাজারে প্রতিদিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও, বেতন বৃদ্ধির আশায় সরকারি চাকুরিজীবীদের অপেক্ষার প্রহর যেন আর শেষ হচ্ছে না।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এসে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবামূল্যের আকাশপাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে কর্মচারীদের বেতন কাঠামোতে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি, যা সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে।
খাদ্যপণ্যের ব্যয় বেড়েছে ১১০% পর্যন্ত
বাজারদর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালির প্রধান খাদ্য চালের দাম ২০১৫ সালে ছিল প্রতি কেজি ৪০ টাকা, যা ২০২৬ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৭৫ টাকায়। অর্থাৎ চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৮৮ শতাংশ। একইভাবে রান্নার অন্যতম প্রধান উপাদান সয়াবিন تেলের দাম লিটার প্রতি ৯৫ টাকা থেকে ৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১৮০ টাকায় ঠেকেছে। চিনির দাম তো আকাশ ছুঁয়েছে; ৫৫ টাকার চিনি এখন ১৩৬ শতাংশ বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়।
আমিষের চাহিদা মেটানোর প্রধান উপাদান ডিম ও ডালের দামেও আগুন লেগেছে। ২০১৫ সালে যে ডিম এক ডজন কিনতে খরচ হতো ৭৫ টাকা, ২০২৬ সালে তা ১২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০ টাকায়। ডালের দাম কেজি প্রতি ৮৫ টাকা থেকে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ টাকা এবং গরিবের তরকারির অন্যতম অনুষঙ্গ পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা থেকে ১৩৩ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া তরল দুধের দাম প্রতি লিটার ৫০ টাকা থেকে ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৯৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ মন্তব্য: “দাম বাড়ে প্রতিদিন, বেতন বাড়ে অপেক্ষার দিন! জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তখন একটি নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ৯ম পে-স্কেল এখন কোনো বিলাসী দাবি নয়, এটি সরকারি কর্মচারীদের টিকে থাকার ন্যায্য অধিকার।”
ইউটিলিটি ও সেবামূল্যের মহাবিস্ফোরণ: গ্যাস সিলিন্ডারে ৫৬৭% বৃদ্ধি
খাদ্যপণ্যের চেয়েও ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে জ্বালানি ও সেবা খাতে। ২০১৫ সালে প্রতি ঘনফুট গ্যাসের দাম যেখানে ছিল মাত্র ৪.৫০ টাকা, ২০২৬ সালে তা অবিশ্বাস্যভাবে ৫৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.০০ টাকায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের রান্নার প্রধান ভরসা ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৮৫০ টাকা থেকে ৭১ শতাংশ বেড়ে এখন ১,৪0 টাকা। বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিটের দাম ৬ টাকা থেকে ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৩ টাকা।
যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যয়ও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০১৫ সালের সর্বনিম্ন বাস ভাড়া ৫ টাকা থেকে ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে হয়েছে ১৫ টাকা। এমনকি মোবাইল রিচার্জের সর্বনিম্ন সীমাও ১০ টাকা থেকে ১৫০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকায়।
২০১৫ বনাম ২০২৬: একটি তুলনামূলক পরিসংখ্যান
| পণ্য / সেবা | ২০১৫ সালের দাম (টাকা) | ২০২৬ সালের দাম (টাকা) | বৃদ্ধি (প্রায়) |
| চাল (কেজি) | ৳ ৪০ | ৳ ৭৫ | ↗ ৮৮% |
| সয়াবিন তেল (লিটার) | ৳ ৯৫ | ৳ ১৮০ | ↗ ৮৯% |
| চিনি (কেজি) | ৳ ৫৫ | ৳ ১৩০ | ↗ ১৩৬% |
| পেঁয়াজ (কেজি) | ৳ ৩০ | ৳ ৭০ | ↗ ১৩৩% |
| ডাল (কেজি) | ৳ ৮৫ | ৳ ১৪০ | ↗ ৬৫% |
| ডিম (ডজন) | ৳ ৭৫ | ৳ ১৭০ | ↗ ১২৭% |
| দুধ (লিটার) | ৳ ৫০ | ৳ ৯৫ | ↗ ৯০% |
| বিদ্যুৎ (প্রতি ইউনিট) | ৳ ৬.০০ | ৳ ১৩.০০ | ↗ ১১৭% |
| গ্যাস (প্রতি ঘনফুট) | ৳ ৪.৫০ | ৳ ৩০.০০ | ↗ ৫৬৭% |
| এলপিজি (১২ কেজি সিলিন্ডার) | ৳ ৮৫০ | ৳ ১,৪৫০ | ↗ ৭১% |
| বাস ভাড়া (ন্যূনতম) | ৳ ৫ | ৳ ১৫ | ↗ ২০০% |
| মোবাইল রিচার্জ (ন্যূনতম) | ৳ ১০ | ৳ ২৫ | ↗ ১৫০% |
কর্মচারীদের আলটিমেটাম: “বিলম্ব নয়, এখনই বাস্তবায়ন চাই”
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন কোনো পে-স্কেল না আসায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বার্ষিক যে ৫% ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়, তা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে একেবারেই নগণ্য। ফলে সৎভাবে সম্মানজনক জীবনযাপন করা প্রজাতন্ত্রের সাধারণ কর্মচারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভুক্তভোগী কর্মচারীদের দাবি, তাদের এই আন্দোলন বা দাবি কোনো অন্যায্য বিষয় নয়, বরং এটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে টিকে থাকার অধিকার। জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন ৯ম পে-স্কেল নিয়ে আর কোনো টালবাহানা বা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা উচিত। “ন্যায্য পে-স্কেল আমাদের অধিকার, বিলম্ব নয়, এখনই বাস্তবায়ন চাই!”— এই স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছে সারা দেশের কর্মচারী সমাজ। সরকার অবিলম্বে এই ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে কর্মচারীদের স্বস্তি ফিরিয়ে দেবে, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।


