নবম পে-স্কেল কার্যকর, ১১-২০তম গ্রেডে বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ; বাড়তি বেতন পেতে অপেক্ষা আরও কয়েক মাস
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বুধবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় বিশেষভাবে সুবিধা পাচ্ছেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে বেতন সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১ থেকে ১০ম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হলেও বর্ধিত বেতন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংক হিসাবে জমা হবে না। কারণ, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং অন্যান্য কারিগরি প্রস্তুতির কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি বেতন হাতে পেতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
নিম্ন গ্রেডে সবচেয়ে বেশি বেতন বৃদ্ধি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ১-১০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট বাস্তবতা বিবেচনায় সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব গুরুত্ব পাচ্ছে
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে দুই ধাপের একটি মডেল নিয়ে কাজ করছে সরকার। আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় সম্পন্ন করা হবে।
তবে বিকল্প হিসেবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। সেই প্রস্তাবে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত কয় ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে, তা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। যদিও সচিব কমিটি মূল্যস্ফীতি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই ধাপের মডেলের প্রতিই বেশি আগ্রহী।
সচিব কমিটির একাধিক বৈঠক
পে-কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটি ইতোমধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে।
কমিটি বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর পৃথক তিনটি পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত মতামত প্রস্তুত করছে। পরে সেই সুপারিশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
আইবিএএস সফটওয়্যার নিয়ে কারিগরি চ্যালেঞ্জ
অর্থ বিভাগের কারিগরি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (IBAS++)-এ ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
তাদের মতে, একবারেই পুরো মূল বেতন কার্যকর করে পরবর্তী ধাপে ভাতা সমন্বয় করা হলে বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। এজন্য সফটওয়্যার হালনাগাদ, বেতন কাঠামো সমন্বয় এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে কিছুটা সময় লাগবে।
ভাতা পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে
নতুন পে-স্কেলের আওতায় বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু ভাতা একীভূত করা কিংবা পুনর্গঠন করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এসব পরিবর্তনের জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও বাস্তবে বাড়তি বেতন প্রদান শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাজেটে বরাদ্দ ৪৪ হাজার কোটি টাকা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
বিশেষজ্ঞদের মত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। তবে তিনি মনে করেন, শুধু বেতন বৃদ্ধি করলেই দুর্নীতি কমবে না। নতুন পে-স্কেলের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদবিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা এবং পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-সম্পদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের মাধ্যমে তাদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারি প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
যা জানা গেল
বর্তমান পরিস্থিতিতে ১ জুলাই থেকে নবম পে-স্কেল কার্যকর হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন অবিলম্বে হাতে আসছে না। প্রজ্ঞাপন জারি, ভাতা পুনর্বিন্যাস, আইবিএএস সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন বেতন অনুযায়ী অর্থ ছাড় শুরু হবে। ফলে বর্ধিত বেতন পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।



