উপজেলা পর্যায়ে ই-জিপি আরএফকিউ (RFQ) পদ্ধতি ২০২৬ । সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিইসি (TEC) গঠনে সদস্য সংখ্যা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কি?
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (CPTU) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। ই-জিপি (e-GP) সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত কোটেশন বা রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন (RFQ) পদ্ধতির ক্ষেত্রে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি (TEC) গঠন এবং ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের (PE) ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন স্তরে প্রায়শই কিছু জটিলতা ও আইনি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে জনবল সংকট এবং পিপিআর-এর বিধানের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
১. টিইসি (TEC) এর সদস্য সংখ্যা ও সাধারণ গঠন
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী আরএফকিউ পদ্ধতির ক্ষেত্রে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির গঠন কাঠামো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:
সদস্য সংখ্যা: পিপিআর-এর বিধান অনুযায়ী আরএফকিউ (RFQ)-এর ক্ষেত্রে টিইসি-র সদস্য সংখ্যা সবসময় ৩ (তিন) জন। জেলা বা উপজেলা নির্বিশেষে সকল দপ্তরে এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না।
সদস্য নির্বাচন: সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী সংস্থা বা প্রকিউরিং এন্টিটি (PE)-র নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকেই এই তিন সদস্যের কমিটি গঠিত হয়।
মূল্যায়ন ও সুপারিশ: এই তিন সদস্যের কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত কোটেশনগুলো যাচাই-বাছাই, টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইভালুয়েশন সম্পন্ন করে উপযুক্ত সুপারিশ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করে।
২. ক্রয়কারী কি মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হতে পারবেন? এবং অনুমোদনকারী ও সভাপতির দ্বন্দ্ব
উপজেলা পর্যায়ে আরএফকিউ-এর ক্ষেত্রে ক্রয়কারী (Procuring Entity) মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হতে পারবেন কি না এবং একই ব্যক্তি অনুমোদনকারী ও সভাপতি হতে পারবেন কি না—এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্ন।
অনুমোদনকারী ও সভাপতির দ্বৈত ভূমিকা: সাধারণত সুশাসন এবং নিরপেক্ষতার স্বার্থে একই ব্যক্তি মূল্যায়ন কমিটির প্রধান (সভাপতি) এবং অনুমোদনকারী (Approving Authority) হতে পারেন না। এতে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।
পিপিআর-এর বিধান (PPR-2025):
পিপিআর-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী টিইসি-র সদস্য সংখ্যা ৩ জন নির্ধারিত থাকলেও সভাপতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু নির্দেশনা রয়েছে।
পিপিআর-এর বিধান অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ে কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র থাকতে পারে। যেমন—যেখানে অনুমোদনকারী কর্মকর্তার নিচে প্রথম শ্রেণির কোনো কর্মকর্তা নেই, সে ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী অনুমোদনকারী নিজেই টিইসি-র সভাপতি হতে পারেন (যেমনটি বিধি ১৩(১)(খ)-তে উল্লেখিত রয়েছে)। তবে এটি একটি নির্দিষ্ট ও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি।
স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): সাধারণ নিয়মে একজন ক্রয়কারী নিজেই মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি হলে তা ইথিক্যাল প্রকিউরমেন্ট বা ন্যায়সঙ্গত ক্রয়ের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ মূল্যায়নকারী নিজেই আবার ফাইল অনুমোদন করলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে জনবল সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের অনেক অফিসে বাস্তবে এই ধরনের চর্চা দেখা গেলেও আইনি কাঠামোর সঠিক ব্যাখ্যা ও পিপিআর-এর বিধি ১৩ এর নির্দেশনা এখানে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনুসরণ করা উচিত।
৩. মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ও জনবল সংকট
উপজেলা পর্যায়ে ক্যাডারভুক্ত বা প্রথম শ্রেণির পর্যাপ্ত কর্মকর্তার দীর্ঘস্থায়ী সংকট থাকার কারণে অনেক দপ্তরেই কাঙ্ক্ষিত অনুপাতে পৃথক মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে, সীমিত জনবল দিয়েই বাধ্য হয়ে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। তবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং অডিট আপত্তি এড়াতে পিপিআর-এর বিধিবিধান ও সরকারের সাম্প্রতিক আর্থিক অনুশাসনগুলো পুরোপুরি মেনে চলা বাঞ্ছনীয়।
৪. উপসংহার
ই-জিপি সিস্টেমে আরএফকিউ পদ্ধতিতে কাজ সম্পাদনের সময় তিন সদস্যের টিইসি কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক হলেও সভাপতি এবং অনুমোদনকারী নির্ধারণের ক্ষেত্রে পিপিআর-এর সংশ্লিষ্ট বিধিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। স্বার্থের সংঘাত এড়াতে এবং সরকারি ক্রয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে জনবল সংকটের মধ্যেও যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ও বিধি মোতাবেক কমিটি গঠন করাই শ্রেয়।



