আগস্টে পরীক্ষামূলক উদ্বোধন, আসছে ‘প্রবাসী কার্ড’; মিলবে ১০টি বিশেষ সুবিধা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য নতুন একটি সেবামূলক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী আগস্ট মাসে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’, যার মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুবিধা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবায় অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রবাসী কার্ড চালুর অগ্রগতি এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আগস্টেই শুরু হবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
বৈঠকে জানানো হয়, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে প্রবাসী কার্ডের পরীক্ষামূলক উদ্বোধন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক-এর মাধ্যমে প্রবাসী ডেবিট কার্ড ইস্যু করা হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে ২ লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরবর্তী পর্যায়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক-এর মাধ্যমে এ কার্ড-সংক্রান্ত সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
কেন চালু হচ্ছে প্রবাসী কার্ড?
সরকার জানিয়েছে, প্রবাসীদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় ও সেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে প্রবাসীদের—
- সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি,
- আর্থিক ক্ষমতায়ন,
- বিভিন্ন সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার,
- আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজীকরণ,
- রেমিট্যান্স প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সুবিধা
একই প্ল্যাটফর্মে নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ডুয়াল কারেন্সি সুবিধাসম্পন্ন কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও ব্যাংকিং কার্যক্রমও সহজ হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রবাসী কার্ডে মিলবে যেসব ১০টি বিশেষ সুবিধা
সরকারি উপস্থাপনায় প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য ১০টি প্রধান সুবিধার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
১. বিমানবন্দর সুবিধা
দেশি-বিদেশি বিমানবন্দরে কমপ্লিমেন্টারি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ এবং বিশেষ ইমিগ্রেশন বুথের মাধ্যমে দ্রুত সেবা।
২. Meet & Greet সেবা
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিনামূল্যে Meet & Greet সুবিধা।
৩. ভ্রমণে বিশেষ ছাড়
বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ মূল্যছাড়।
৪. পরিবহন সুবিধা
দেশে ও বিদেশে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিং এবং নির্দিষ্ট কার্ডধারীদের জন্য এয়ারপোর্ট Pick & Drop সেবা।
৫. স্বাস্থ্যসেবা
সরকারি হাসপাতালে প্রবাসী সেবা বুথ এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় বিশেষ ছাড়।
৬. মরদেহ দেশে আনা
কার্ডধারীর মৃত্যু হলে বিনা খরচে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সুবিধা।
৭. পুনর্বাসন ও বীমা
প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং বীমা সুবিধা।
৮. সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার
জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ, লাইসেন্স প্রদান এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে অগ্রাধিকার।
৯. আর্থিক সুবিধা
রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্রেডিট স্কোরিং, ঋণ সুবিধা এবং কার্ডের মাধ্যমে সহজে অর্থ প্রেরণ ও লেনদেন।
১০. সরকারি পরিচয় ও ব্যাংকিং সেবা
জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), পাসপোর্ট, কনস্যুলার সেবা, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় অগ্রাধিকার।
নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ
বৈঠকে জানানো হয়, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ক্রীড়া কার্ড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কার্ডও সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি।
দক্ষতা উন্নয়নেও জোর
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করার নির্দেশনা দেন। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সব বাংলাদেশি প্রবাসী যাতে পর্যায়ক্রমে প্রবাসী কার্ডের আওতায় আসতে পারেন, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কারা উপস্থিত ছিলেন
বৈঠকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা বিমানবন্দর, ব্যাংকিং, চিকিৎসা, সরকারি সেবা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। প্রস্তাবিত প্রবাসী কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে একক পরিচয়ের মাধ্যমে বহু ধরনের সেবা পাওয়া সহজ হবে এবং প্রবাসীবান্ধব সেবা ব্যবস্থার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
তবে কার্ডটির আবেদন প্রক্রিয়া, যোগ্যতার শর্ত, ফি, কারা অগ্রাধিকার পাবেন এবং সেবাগুলো বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে সরকার এখনও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।



