পে-স্কেল I গেজেট । প্রজ্ঞাপন । পরিপত্র

প্রাথমিক শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অর্থ বিভাগের অসম্মতি, ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবিই থাকছে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছে অর্থ বিভাগ। ফলে আপাতত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘শিক্ষক’ এবং পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার প্রস্তাবটি অনুমোদন পাচ্ছে না।

রবিবার (১১ অক্টোবর) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের জারি করা একটি স্মারকে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। এর আগে অর্থ বিভাগের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের পত্রে প্রস্তাবিত পদবি পরিবর্তনের বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট পত্রাচার থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

কী ছিল পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব?

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দুটি পদের নাম পরিবর্তনের কথা বলা হয়।

১. ‘সহকারী শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষক’: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদবি পরিবর্তন করে শুধু ‘শিক্ষক’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

২. ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ থেকে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’: প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিদ্যমান পদবি পরিবর্তন করে নতুন পদবি নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রস্তাব অর্থ বিভাগের বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে অর্থ বিভাগ তাতে সম্মতি দেয়নি। ফলে পদবি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি আপাতত এগোচ্ছে না।

কেন প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি অর্থ বিভাগ?

অর্থ বিভাগের পত্রে পদবি পরিবর্তনের বিষয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথমত, প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা। অর্থ বিভাগের বিবেচনায়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন এসব পদের নাম পরিবর্তন করা হলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে নতুন করে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা। অর্থ বিভাগের মতামত অনুযায়ী, শুধু পদবি পরিবর্তন করলে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখবে না। এ কারণে প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে যৌক্তিক বলে বিবেচনা করা হয়নি।

অর্থ বিভাগের পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ এবং ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘শিক্ষক’ করার প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করা হলো।

অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট পদগুলোর নাম পরিবর্তনের বিষয়ে অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়নি। তবে এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষকদের বেতন-গ্রেড, পদোন্নতি বা অন্যান্য চাকরিসুবিধা নিয়ে পৃথক কোনো সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।

মন্ত্রণালয় থেকে অধিদপ্তরে জানানো হলো সিদ্ধান্ত

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা অর্থ বিভাগের অসম্মতির বিষয়টি পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানায়। এরপর অধিদপ্তর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের স্মারকে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছে। সে অনুযায়ী বিষয়টি নির্দেশক্রমে অবহিত করা হলো।

এতে স্পষ্ট হয়, পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবটি নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের মধ্যে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতি পাওয়া যায়নি।

সহকারী শিক্ষকদের জন্য এর অর্থ কী?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের জন্য এ সিদ্ধান্তের তাৎপর্য হলো, শুধু এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাঁদের পদবি পরিবর্তন হচ্ছে না। নতুন কোনো অনুমোদিত সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান পদবিই বহাল থাকবে।

তবে এ বিষয়ে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন।

এক. পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়নি। ‘সহকারী শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষক’ করার প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগের সম্মতি পায়নি।

দুই. বেতন-গ্রেড পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এটি নয়। পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অসম্মতি এবং বেতন-গ্রেড নির্ধারণ দুটি আলাদা বিষয়। এই পত্রে শিক্ষকদের বেতন-গ্রেড পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

তিন. পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেই। পত্রটির বিষয়বস্তু পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট কিংবা আর্থিক সুবিধা নিয়ে এতে নতুন কোনো নির্দেশনা উল্লেখ নেই।

চার. ভবিষ্যতে নতুন প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি আলাদা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে নতুন কোনো প্রস্তাব বা সংশোধিত উদ্যোগ নিলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তবে এমন কোনো নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা এই পত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও কী হবে?

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবটিও একই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়েছে। তাঁদের ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার প্রস্তাবেও অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়নি।

ফলে এ ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত নতুন পদবি কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নতুন অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আদেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা

সরকারি চাকরিতে পদবির বিষয়টি শুধু নামের পরিবর্তন নয়; অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে পদভিত্তিক দায়িত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো, নিয়োগবিধি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনার সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

তবে পদবি পরিবর্তন করলেই যে বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি বা চাকরির অন্যান্য সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। এসব সুবিধা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, অনুমোদিত কাঠামো এবং পৃথক সরকারি আদেশের ওপর নির্ভর করে।

এ ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের আপত্তির মূল বিষয় ছিল সম্ভাব্য প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রস্তাবটির কার্যকারিতা। ফলে পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবটি অনুমোদন না পাওয়াকে শিক্ষকদের অন্যান্য অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

এখন শিক্ষকদের করণীয় কী?

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকারি আদেশের সঠিক ব্যাখ্যা জানা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পদবি পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন দাবি ছড়ালেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং অর্থ বিভাগের দাপ্তরিক নথিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

বিশেষ করে পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাব, বেতন-গ্রেড, পদোন্নতি এবং আর্থিক সুবিধার বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখতে হবে। একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা অন্য বিষয়েও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন ধারণা থেকে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

শেষ কথা

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অর্থ বিভাগের অসম্মতির কারণে প্রস্তাবিত পরিবর্তন আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘শিক্ষক’ এবং ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক’ পদবি পরিবর্তন করে ‘সহকারী ইন্সট্রাক্টর (পরীক্ষণ বিদ্যালয়)’ করার উদ্যোগটি অর্থ বিভাগের সম্মতি পায়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নতুন কোনো অনুমোদিত সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন পদবি কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে, এই সিদ্ধান্তকে বেতন-গ্রেড, পদোন্নতি কিংবা অন্যান্য চাকরিসুবিধা পরিবর্তনের নির্দেশনা হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না।

সোর্স ফাইল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

2 thoughts on “প্রাথমিক শিক্ষকদের পদবি পরিবর্তনের প্রস্তাবে অর্থ বিভাগের অসম্মতি, ‘সহকারী শিক্ষক’ পদবিই থাকছে”

  • আমি একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বেতন বৃদ্ধির সংগে সংগে যে কোন কর্মকর্তা/ কর্মচারী জিপি এফ ফান্ড কমাতে বা বাড়াতে পারে আইবাস ++ এই ব্যবস্থা থাকলে সবচেয়ে বেশী ভাল হয়।

  • শিঘ্রই এটি চালু হচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা জারি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *