শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী কর্মচারীর অকাল মৃত্যু: ১৫ বছর পর বিধবা স্ত্রীর পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তির আইনি বাস্তবতা
অবসরে যাওয়ার পরপরই পারিবারিক ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিংবা তাৎক্ষণিক তীব্র আর্থিক প্রয়োজনে নিজের অর্জিত শতভাগ পেনশন সরকারের কাছে বিক্রি (সমর্পণ) করে দিয়েছিলেন এক সরকারি কর্মচারী। সমর্পণের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। আজ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তাঁর বিধবা স্ত্রী কেবল নামমাত্র সরকারি চিকিৎসা ভাতাটুকু পেয়ে চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর পর আজ কি কোনোভাবে এই পেনশন পুনঃস্থাপিত হয়ে অসহায় বিধবা স্ত্রীর কাছে ‘পারিবারিক পেনশন’ হিসেবে ফিরে আসতে পারে? অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ও বিদ্যমান বিধিমালা এ বিষয়ে কী বলে? অভিজ্ঞদের মতামত ও সরকারি প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে এর একটি স্পষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালা
শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুবিভাগ (বিধি-১ অধিশাখা) গত ০৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে একটি যুগান্তকারী প্রজ্ঞাপন (নম্বর: ০৭.০০.০০০০.১৭১.১৩.০১৩.১৪-১১৬) জারি করে।
উক্ত প্রজ্ঞাপনের প্রধান শর্তসমূহ নিম্নরূপ: ১. ১৫ বছরের সময়সীমা: প্রজ্ঞাপনের (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের অবসর গ্রহণের তারিখ হতে ১৫ বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাদের মাসিক পেনশন পুনঃস্থাপন করা হবে। কর্মচারীর এলপিআর/পিআরএল যে তারিখে শেষ হয়েছে, তার পরদিন হতে এই ১৫ বছর সময় গণনা করা হবে। ২. কার্যকরী তারিখ: এই সুবিধাটি ০১ জুলাই ২০১৭ তারিখ থেকে কার্যকর করা হয়েছে। তবে এই তারিখের পূর্বের কোনো আর্থিক বকেয়া সুবিধা প্রদেয় হবে না। ৩. বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: পুনঃস্থাপিত পেনশনের ওপর প্রতি বছর ১লা জুলাই তারিখে ৫% হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদেয় হবে।
জটিলতা যেখানে: পুনঃস্থাপনের পূর্বে পেনশনারের মৃত্যু
আলোচ্য ঘটনার সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং আইনি জটিলতার দিকটি হলো—পেনশনার অবসরে যাওয়ার পরপরই (১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার বহু আগে) মারা গেছেন।
বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী:
পেনশনার জীবিত থাকা আবশ্যক: পেনশন পুনঃস্থাপনের মূল শর্ত হলো সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে অবসরের পর ১৫ বছর জীবিত থাকতে হবে। তিনি জীবিত অবস্থায় ১৫ বছর পূর্ণ করলে তাঁর পেনশনটি পুনঃস্থাপিত (পুনরুজ্জীবিত) হয়।
পুনঃস্থাপনের পূর্বে মৃত্যু: যদি কোনো পেনশনার ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যান, তবে তাঁর ক্ষেত্রে পেনশনটি আর পুনঃস্থাপিত হওয়ার আইনি সুযোগ থাকে না। যেহেতু মূল পেনশনারের জন্যই পেনশনটি কাগজে-কলমে পুনরুজ্জীবিত হয়নি, তাই তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী বা পরিবারের কাছে এটি ‘পারিবারিক পেনশন’ হিসেবে স্থানান্তরিত হতে পারে না।
বর্তমান প্রাপ্তি: এই আইনি বাধার কারণেই উক্ত বিধবা স্ত্রী বিগত ১৫ বছর ধরে মূল পেনশন বা পূর্ণ পারিবারিক পেনশন পাচ্ছেন না। তিনি কেবল সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারিত মাসিক চিকিৎসা ভাতা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উৎসব ভাতা (বোনাস) পেয়ে আসছেন।
একটি মানবিক ও সামাজিক শূন্যতা
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, পূর্ণ পেনশন বিক্রি করে স্বামী মারা যাওয়ার সময় সেই অর্থ কোথায় বা কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা রাষ্ট্র বা প্রশাসনের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। অনেক সময় দেখা যায়, পেনশনের এককালীন অর্থ পারিবারিক চিকিৎসা, ঋণ পরিশোধ বা অন্য কোনো জরুরি সংকটে দ্রুত শেষ হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে, দীর্ঘ সময় পর পরিবারটি বিশেষ করে প্রবীণ বিধবা স্ত্রী সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
যদিও সরকারের ২০১৮ সালের প্রজ্ঞাপনটি জীবিত শতভাগ সমর্পণকারীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছিল, কিন্তু “পেনশন পুনঃস্থাপনের পূর্বেই পেনশনার মারা গেলে পরিবারের কী হবে”—এই বিশেষ মানবিক দিকটি নিয়ে এখনও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে শিথিলযোগ্য কোনো সম্পূরক স্পষ্টীকরণ বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। ফলে সাধারণ প্রশাসনিক নিয়মে এই মুহূর্তে উক্ত অসহায় বিধবা স্ত্রীর পক্ষে পেনশন সুবিধা ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়
সার্বিক তথ্যাদি ও সরকারি প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট বলা যায় যে, বর্তমান প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী ওই পেনশনারের স্ত্রী দীর্ঘ ১৫ বছর পরও সাধারণ নিয়মে পারিবারিক পেনশন ফিরে পাবেন না।
তবে সম্পূর্ণ মানবিক দিক বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট বিধবা স্ত্রী সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় (বিধি অনুবিভাগ) অথবা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ বিবেচনা বা অনুকম্পা প্রদর্শনের জন্য একটি লিখিত মানবিক আবেদন পেশ করতে পারেন। রাষ্ট্র যদি বিশেষ নির্বাহী আদেশে বা কল্যাণ তহবিল থেকে তাঁর জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবেই কেবল এই সংকটের সমাধান সম্ভব, সাধারণ নামজারী বা হিসাবরক্ষণ অফিসের মাধ্যমে নয়।


