সরকারি কেনাকাটায় নতুন যুগ: বাধ্যতামূলক হলো ই-জিপি, অফলাইনে বড় ধরনের বিল করা যাবে না
সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম রোধ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) ২০০৮’ প্রতিস্থাপন করে কার্যকর করা হয়েছে নতুন ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫’। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ গেজেটে (এস.আর.ও নং ৩৮৮-আইন/২০২৫) প্রকাশের মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়। নতুন এই বিধিমালার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—দেশের সকল সরকারি দপ্তরের জন্য ই-জিপি (e-GP) পোর্টাল ব্যবহার করে কেনাকাটা সম্পন্ন করা এখন থেকে বাধ্যতামূলক।
১. শতভাগ ই-জিপি এবং ডিজিটাল রূপান্তর
নতুন বিধিমালার ১৫০(১) বিধি অনুযায়ী, সরকারি সকল ক্রয়কারী সংস্থাকে তাদের ক্রয় পরিকল্পনা (APP) থেকে শুরু করে দরপত্র আহ্বান এবং চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ই-জিপি পোর্টালের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। এমনকি যেসব এলাকায় আইসিটি অবকাঠামো বা জনবল সংকট রয়েছে, সেখানেও সীমিত সময়ের জন্য ম্যানুয়াল টেন্ডারের সুযোগ পেতে বিপিপিএ (BPPA)-এর পূর্বানুমোদন নেওয়া আবশ্যক।
২. ১০ শতাংশ মূল্যসীমা (Plus-Minus) বিলুপ্তি
দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কার্য ক্রয়ে দরপত্রের দাপ্তরিক প্রাক্কলনের চেয়ে ১০ শতাংশ কম বা বেশি দরের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা নতুন পিপিআর-এ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে দরদাতারা এখন প্রতিযোগিতামূলক এবং বাজারমুখী দর প্রদান করতে পারবেন।
৩. ‘সিগনিফিক্যান্টলি লো টেন্ডার’ (SLT) নির্ধারণের নতুন পদ্ধতি
অস্বাভাবিক কম দরে কাজ নিয়ে পরে গুণমান বজায় না রাখার প্রবণতা বন্ধ করতে নতুন একটি গাণিতিক ফর্মুলা যুক্ত করা হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারী দরদাতাদের গড় দর (৫০%), দাপ্তরিক প্রাক্কলন (২০%) এবং ই-জিপি বাজারের সাম্প্রতিক দরের (৩০%) সমন্বয়ে একটি ভিত্তি নির্ধারণ করা হবে। যদি কোনো দরপত্র এই সীমার চেয়ে অনেক কম হয়, তবে তাকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হবে।
৪. টেকসই সরকারি ক্রয় (Sustainable Procurement)
বাংলাদেশ প্রথমবার বিধিমালায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাসটেইনেবল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (SPP)’ প্রবর্তন করেছে। এর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা ক্রয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
৫. প্রকৃত মালিকানা বা বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ (Beneficial Ownership)
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও বেনামে কাজ নেওয়া বন্ধ করতে এখন থেকে দরপত্রদাতাদের প্রকৃত মালিকানা বা ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ’ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সমান সুযোগ পাবেন।
৬. ডিবারমেন্ট বোর্ড গঠন
অসদাচরণ বা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে একটি কেন্দ্রীয় ‘ডিবারমেন্ট বোর্ড’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে।
বিপিপিএ-এর মন্তব্য:
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ জানান, “নতুন এই বিধিমালা দেশের সরকারি ক্রয় সংস্কারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার (Value for Money) এবং কেনাকাটায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে।”
সারসংক্ষেপ: কী কী পরিবর্তন এলো?
| বিষয় | আগের নিয়ম (PPR-2008) | নতুন নিয়ম (PPR-2025) |
| ই-জিপি | ঐচ্ছিক/আংশিক বাধ্যতামূলক ছিল | শতভাগ বাধ্যতামূলক |
| মূল্যসীমা | প্রাক্কলনের ±১০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ | বাতিল করা হয়েছে |
| মালিকানা তথ্য | বিস্তারিত প্রয়োজন হতো না | প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ বাধ্যতামূলক |
| টেন্ডারের বৈধতা | ৬০-১২০ দিন | ৬০-১৫০ দিন |
নতুন এই বিধিমালা বাস্তবায়নের ফলে সরকারি কেনাকাটায় দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার পথে ক্রয় প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ছোট নগদ ক্রয় কি ই জিপি ছাড়া করা যাবে?
পিপিআর-২০২৫ (PPR-2025) অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কেনাকাটাকে ‘নগদ ক্রয়’ বা Direct Cash Purchase হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ই-জিপি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিধিমালায় যা বলা হয়েছে:
নগদ ক্রয়ে ই-জিপি কি বাধ্যতামূলক?
না, অত্যন্ত ছোট বা জরুরি কেনাকাটার ক্ষেত্রে (Direct Cash Purchase) ই-জিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা এবং শর্ত মেনে চলতে হয়:
আর্থিক সীমা: বিধিমালা অনুযায়ী, পণ্য বা সংশ্লিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট অর্থবছর বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যে ‘নগদ ক্রয় সীমা’ নির্ধারণ করা থাকে (সাধারণত খুব অল্প পরিমাণের কেনাকাটা), তা ই-জিপি পোর্টাল ছাড়াই সরাসরি নগদ অর্থে সম্পন্ন করা যায়।
শর্ত: এই ক্রয়ের জন্য ক্যাশ মেমো বা ভাউচার সংগ্রহ করতে হয় এবং দপ্তর প্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
ই-জিপি কেন প্রয়োজন নেই: ই-জিপি মূলত উন্মুক্ত বা সীমিত দরপত্র (LTM/OTM) এবং কোটেশন (RFQ) প্রক্রিয়ার জন্য। অতি ক্ষুদ্র দৈনন্দিন কেনাকাটার জন্য টেন্ডার আহ্বান করার প্রয়োজন হয় না বলেই এটি ই-জিপির বাইরে রাখা হয়েছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে:
যদিও নগদ ক্রয় ই-জিপি ছাড়াই করা যায়, কিন্তু নতুন বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি সরকারি দপ্তরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (APP) ই-জিপি পোর্টালে আপলোড করা বাধ্যতামূলক।
১. আপনি যদি সারা বছরের জন্য ছোট ছোট কেনাকাটার পরিকল্পনা করেন, তবে সেই পরিকল্পনাটি (APP) ই-জিপিতে থাকতে হবে। ২. নগদ ক্রয়ের মোট পরিমাণ যেন বিধিবদ্ধ সীমার (Threshold) বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সীমা অতিক্রম করলে অবশ্যই কোটেশন (RFQ) বা ই-জিপি পদ্ধতিতে যেতে হবে।
সহজ কথায়: ছোটখাটো স্টেশনারি বা জরুরি মেরামতের মতো ‘নগদ ক্রয়’ আপনি ই-জিপি ছাড়াই করতে পারবেন, তবে তার সঠিক হিসাব ও ভাউচার সংরক্ষণ করতে হবে।



