পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

সরকারি চাকরিজীবীর পেনশনে কি ভাই-বোনের অধিকার আছে? উত্তরাধিকার সনদ নিয়ে ভোগান্তিতে একটি পরিবার

সরকারি চাকরিজীবীর মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা ও অন্যান্য সুবিধা প্রাপ্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বা সংশ্লিষ্ট এলাকা। আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সাধারণ ‘ওয়ারিশান সনদ’ প্রদান করায় বিপাকে পড়েছেন বন বিভাগ থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া এক কর্মকর্তার পরিবার। বিধি অনুযায়ী পেনশনের টাকা শুধুমাত্র স্ত্রী ও সন্তানরা পাওয়ার কথা থাকলেও, সনদে ভাই-বোনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আটকে গেছে ভাতার ফাইল।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

গত জানুয়ারি মাসে বন বিভাগ থেকে অবসরে যান একজন সরকারি কর্মকর্তা। দুর্ভাগ্যবশত, পেনশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার আগেই ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও তিন কন্যা রেখে যান। নিয়ম অনুযায়ী, তার দীর্ঘ ২১-২২ বছরের চাকরির পেনশন ও গ্র্যাচুইটির টাকা তার পরিবার পাওয়ার কথা। কিন্তু স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস থেকে যে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে, তাতে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি ৮-৯ জন ভাই-বোনের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বন বিভাগ এই সনদ গ্রহণ করছে না, কারণ পেনশনের বিধিমালায় ভাই-বোনের কোনো অংশ নেই।

পেনশন বিধিমালা কী বলে?

বাংলাদেশ সরকারি চাকরিজীবী (পেনশন) বিধিমালা অনুযায়ী, একজন চাকরিজীবীর মৃত্যুর পর তার পেনশনের স্বত্বাধিকারী হবেন কেবল তার ‘পরিবার’। এখানে ‘পরিবার’ বলতে বোঝায়: ১. মৃত চাকরিজীবীর স্ত্রী বা স্বামী। ২. তাঁর ওপর নির্ভরশীল সন্তানসমূহ (ছেলে ও মেয়ে)।

পেনশন বিধিমালায় স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, স্ত্রী ও সন্তান জীবিত থাকা অবস্থায় ভাই-বোন বা অন্য কোনো আত্মীয় পেনশনের টাকার অংশীদার হতে পারবেন না। সাধারণ উত্তরাধিকার সনদ (সাকসেশন সার্টিফিকেট) যা জমির বা সাধারণ ব্যাংক হিসেবের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তার সাথে পেনশনের ওয়ারিশ সনদের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

ভুল কোথায় হচ্ছে?

অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) অনুযায়ী ঢালাওভাবে ভাই-বোনসহ সবার নাম দিয়ে ওয়ারিশ সনদ প্রদান করে। কিন্তু সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য পেনশনের বিশেষ ফরম রয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জটিলতা নিরসনে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

  • পেনশন ফরম পূরণ: সাধারণ কাগজে ওয়ারিশ সনদ না নিয়ে, সরকারের নির্দিষ্ট ‘পেনশন ফরম’ সংগ্রহ করতে হবে। সেখানে শুধুমাত্র পরিবার (স্ত্রী ও সন্তানদের) তথ্য পূরণ করতে হবে।

  • চেয়ারম্যান/কাউন্সিলরের প্রত্যয়ন: ওই ফরমে ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউপি চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ও সিল নিতে হবে। যদি তারা আইন দেখিয়ে অস্বীকার করেন, তবে তাদের বুঝাতে হবে যে এটি সাধারণ সম্পত্তির বন্টন নয়, বরং সরকারি পেনশন বিধি অনুযায়ী ‘পারিবারিক পেনশন’ প্রাপ্তির আবেদন।

  • প্রশাসনের হস্তক্ষেপ: যদি স্থানীয় প্রতিনিধিরা সঠিক সনদ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে ভুক্তভোগী পরিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে লিখিত আবেদন করতে পারেন। প্রশাসন থেকে নির্দেশনা দিলে জনপ্রতিনিধিরা সঠিক সনদ দিতে বাধ্য।

  • বিভাগীয় প্রধানের প্রতিস্বাক্ষর: পেনশনের জন্য তৈরি করা ওই ওয়ারিশান তালিকায় মৃত ব্যক্তির অফিস প্রধানের প্রতিস্বাক্ষর নিয়ে তা হিসাবরক্ষণ অফিসে জমা দিতে হবে।

উপসংহার

একজন মানুষ সারা জীবন সরকারি সেবা দিয়ে শেষ বয়সে এসে যদি তার পরিবার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উচিত সরকারি আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে শোকাতুর পরিবারটি আরও বেশি হয়রানির শিকার না হয়।


পরামর্শ: আপনার দুলাভাইয়ের স্ত্রী যেন দ্রুত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর সাথে দেখা করে বিষয়টি জানান। পেনশনের ক্ষেত্রে ভাই-বোনের কোনো আইনি ভিত্তি নেই, তাই ওয়ার্ড অফিসের এই ভুল সনদ বাতিল করে শুধুমাত্র স্ত্রী-সন্তানদের নামে নতুন ‘পেনশন ওয়ারিশান সনদ’ নেওয়াটাই এই সংকটের একমাত্র সমাধান।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *