সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ: নিরাপদ সঞ্চয়ের সুযোগ, কারা কিনবেন এবং কীভাবে মিলবে মুনাফা?
ব্যক্তিগত সঞ্চয়, অবসরকালীন তহবিল কিংবা প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড হতে পারে বিবেচনাযোগ্য একটি মাধ্যম। বাংলাদেশ সরকার তার অর্থায়নের প্রয়োজনে এসব সিকিউরিটিজ ইস্যু করে। ব্যক্তি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ভবিষ্যৎ তহবিল ও পেনশন তহবিলের মতো যোগ্য বিনিয়োগকারীরাও নির্ধারিত নিয়মে এসব সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে পারেন।
সোনালী ব্যাংক পিএলসির প্রচারমূলক তথ্যে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের যোগ্যতা, বিনিয়োগের পরিমাণ, ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি, মুনাফা, কর এবং ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ব্যাংক ও প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। <Cite refs={[“turn873415search0″,”turn873415search1”]}/>
ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড কী?
ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড—দুটিই সরকার ইস্যু করা ঋণপত্র। তবে এদের প্রধান পার্থক্য হলো মেয়াদ, মুনাফা প্রদানের ধরন এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার পদ্ধতিতে।
ট্রেজারি বিল: সাধারণত স্বল্পমেয়াদি সরকারি সিকিউরিটিজ। প্রচলিত মেয়াদের মধ্যে ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিনের বিল রয়েছে। সাধারণত অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিল কেনা হয় এবং মেয়াদ শেষে অভিহিত মূল্য পাওয়া যায়। ক্রয়মূল্য ও মেয়াদান্তে প্রাপ্ত অর্থের পার্থক্যই বিনিয়োগকারীর আয়।
ট্রেজারি বন্ড: তুলনামূলক দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সিকিউরিটিজ। বিভিন্ন মেয়াদের বন্ড রয়েছে এবং সাধারণত নির্ধারিত সময় অন্তর কুপন বা সুদ দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে শর্ত অনুযায়ী মূল অর্থ ফেরত পাওয়া যায়। বাজারে বন্ডের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য ও প্রকৃত মুনাফার হার পরিবর্তিত হতে পারে। <Cite refs={[“turn873415search0″,”turn873415search5”]}/>
কারা ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনতে পারবেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি সিকিউরিটিজবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলাদেশের নাগরিক ব্যক্তি বিনিয়োগকারী।
- দেশীয় কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান।
- বিমা কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
- ভবিষ্যৎ তহবিল, পেনশন তহবিল ও যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী।
- নির্ধারিত নিয়মে যোগ্য অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারী।
ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানভেদে প্রয়োজনীয় হিসাব, পরিচয়পত্র, করসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের শর্ত ভিন্ন হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে হালনাগাদ শর্ত জেনে নেওয়া প্রয়োজন। <Cite refs={[“turn873415search0″,”turn873415search5”]}/>
সর্বনিম্ন কত টাকা দিয়ে বিনিয়োগ করা যাবে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামে প্রচলিত ন্যূনতম বিডের পরিমাণ ১ লাখ টাকা এবং এর গুণিতক। তবে ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি কেনা, সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে কেনা এবং নির্দিষ্ট বিনিয়োগ পদ্ধতিতে কার্যকর শর্ত যাচাই করা জরুরি। <Cite refs={[“turn873415search0”]}/>
অর্থাৎ, অল্প অল্প করে সঞ্চয় করা প্রত্যেকের জন্য একই শর্তে সরাসরি ট্রেজারি বিল বা বন্ড কেনা সম্ভব হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, হিসাবের ধরন এবং ব্যাংকের প্রযোজ্য নিয়ম আগে জেনে নিতে হবে।
ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার পদ্ধতি
ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
প্রথম ধাপ: ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ট্রেজারি বা সরকারি সিকিউরিটিজ বিভাগে যোগাযোগ করে বিনিয়োগের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ন্যূনতম অর্থ ও বর্তমান মুনাফার হার সম্পর্কে জানতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় হিসাব ও পরিচয় যাচাই। ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচয়পত্র, গ্রাহক-তথ্য, ব্যাংক হিসাব এবং প্রযোজ্য করসংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: বিনিয়োগের ধরন নির্বাচন। স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল অথবা নির্ধারিত মেয়াদের ট্রেজারি বন্ড—কোনটি কেনা হবে, তা নিজের অর্থের প্রয়োজন ও বিনিয়োগের সময়সীমা বিবেচনা করে ঠিক করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: নিলাম বা ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ। অনুমোদিত ব্যাংক বা প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে প্রযোজ্য নিয়মে নিলামে অংশ নেওয়া কিংবা সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে সিকিউরিটিজ কেনা যায়।
পঞ্চম ধাপ: লেনদেনের নথি সংরক্ষণ। ক্রয়মূল্য, সিকিউরিটিজের পরিমাণ, মেয়াদ, মুনাফার হার এবং মেয়াদান্তে অর্থ পাওয়ার শর্ত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উচিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় প্রাইমারি ডিলারের মাধ্যমে নিলামে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা উল্লেখ রয়েছে। ব্যাংকভেদে গ্রাহকসেবা ও আবেদনপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত ভিন্ন হতে পারে। <Cite refs={[“turn873415search0”]}/>
মুনাফা কত পাওয়া যাবে?
ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মুনাফা নির্দিষ্ট একটি স্থায়ী হার নয়। নিলামের ফল, সিকিউরিটিজের মেয়াদ, ক্রয়মূল্য এবং বাজারের পরিস্থিতির ওপর প্রকৃত আয় নির্ভর করে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ট্রেজারি বিলের অভিহিত মূল্য ১ লাখ টাকা এবং ক্রয়মূল্য ৯৭ হাজার টাকা হলে, মেয়াদ শেষে শর্ত অনুযায়ী ১ লাখ টাকা ফেরত পাওয়া গেলে মোট আয় হবে ৩ হাজার টাকা। তবে এটি কেবল হিসাব বোঝানোর উদাহরণ, বর্তমান বাজারদর বা নির্দিষ্ট বিলের মুনাফার প্রস্তাব নয়। প্রকৃত বার্ষিকীকৃত মুনাফার হার নির্ণয়ে বিনিয়োগের সময়কাল ও প্রযোজ্য হিসাবপদ্ধতি বিবেচনা করতে হবে।
ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কুপন হার থাকলেও বাজারদরে কেনার কারণে বিনিয়োগকারীর প্রকৃত মুনাফার হার ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু ঘোষিত সুদের হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ক্রয়মূল্য, মেয়াদ, কর ও সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য যাচাই করা জরুরি। <Cite refs={[“turn873415search0″,”turn873415search5”]}/>
বিনিয়োগের আগে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
ট্রেজারি বিল ও বন্ডকে সাধারণত সরকারের ঋণপরিশোধের দায়ের সঙ্গে যুক্ত তুলনামূলক কম ঋণঝুঁকির বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারী কোনো ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বেন না।
- মেয়াদ: কখন অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে, তা আগে জানতে হবে।
- তারল্য: মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিক্রি করতে হলে বাজারদর অনুযায়ী কম বা বেশি অর্থ পাওয়া যেতে পারে।
- মুনাফার হার: নিলামের ফল ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে হার পরিবর্তিত হতে পারে।
- কর: প্রযোজ্য আইন ও বিনিয়োগকারীর শ্রেণি অনুযায়ী করের বিষয়টি যাচাই করতে হবে।
- ব্যাংক চার্জ: ব্যাংকের কমিশন, সেবা ফি বা অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ থাকলে তা হিসাব করতে হবে।
- অর্থের প্রয়োজন: জরুরি প্রয়োজনে লাগতে পারে এমন অর্থ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আটকে রাখা উচিত নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি সিকিউরিটিজবিষয়ক প্রশ্নোত্তরে ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্ব নগদায়নের সুযোগ না থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে সেকেন্ডারি মার্কেটে বিক্রির সুযোগ ও প্রযোজ্য শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করতে হয়। <Cite refs={[“turn873415search0”]}/>
উপসংহার
সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড ব্যক্তিগত সঞ্চয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বর্তমান নিলাম-হার, ক্রয়মূল্য, মেয়াদ, কর, তারল্য এবং ব্যাংকের শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। নিরাপদ আর্থিক পরিকল্পনার জন্য সব অর্থ এক জায়গায় বিনিয়োগ না করে নিজের প্রয়োজন ও ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।



