সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের আগে যে ৫ বিষয় না জানলেই বিপদ, জরুরি প্রয়োজনে আটকে যেতে পারে টাকা
নিরাপদ বিনিয়োগ ও তুলনামূলক স্থিতিশীল মুনাফার আশায় দেশের অনেক মানুষ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং নিয়মিত ঝুঁকিমুক্ত আয় প্রত্যাশীদের কাছে সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় বিনিয়োগ মাধ্যম। তবে শুধু মুনাফার হার দেখে সঞ্চয়পত্র কিনলে পরবর্তী সময়ে আর্থিক সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সঞ্চয়পত্র সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কেনা হয়। অনেক স্কিমের মেয়াদ পাঁচ বছর বা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে হলে প্রত্যাশিত মুনাফা কমে যেতে পারে। বিনিয়োগের পরিমাণ, করসংক্রান্ত নিয়ম, মুনাফা পাওয়ার সময়সূচি এবং ব্যক্তিগত আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনা না করেও অনেকেই বিনিয়োগ করেন।
ফলে সঞ্চয়পত্র কেনার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১. জরুরি প্রয়োজনে টাকা আটকে যাওয়ার ঝুঁকি
সঞ্চয়পত্র কেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—এই বিনিয়োগে রাখা অর্থের প্রয়োজনীয়তা আগে থেকেই বিবেচনা করা।
চিকিৎসা, পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতি, চাকরি হারানো, ব্যবসায়িক সংকট কিংবা অন্য কোনো আকস্মিক প্রয়োজনের জন্য লাগতে পারে—এমন অর্থ দীর্ঘ সময়ের জন্য সঞ্চয়পত্রে আটকে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ, নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে হলে পূর্ণ মেয়াদের মুনাফা পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী কম হারে মুনাফা হিসাব করা হয় বা অন্যান্য কর্তন প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই আর্থিক পরিকল্পনাকারীদের সাধারণ পরামর্শ হলো, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে যাওয়ার আগে জরুরি তহবিল আলাদা রাখতে হবে।
যদি কারও ধারণা থাকে যে আগামী কয়েক মাস বা এক বছরের মধ্যে ওই টাকার প্রয়োজন হতে পারে, তাহলে পুরো অর্থ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করাই তুলনামূলক নিরাপদ সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, জরুরি তহবিল আগে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরে—এই নীতিতে এগোনো উচিত।
২. বিনিয়োগের স্তর ও সীমা না বুঝে টাকা রাখা
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুনাফার হার সব বিনিয়োগকারীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত স্তর অনুযায়ী মুনাফার হারে পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের আগে বর্তমান বিনিয়োগসীমা, ধাপভিত্তিক মুনাফার হার এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
অনেক বিনিয়োগকারী শুধু একটি খাতে বা এক ধরনের সঞ্চয়পত্রে সব অর্থ রাখেন। এতে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে পরিবারের সদস্যদের নামে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু বেশি মুনাফা বা কর সুবিধার কথা বিবেচনা করলেই হবে না; অর্থের প্রকৃত মালিকানা, উপহার বা হস্তান্তরের আইনগত বিষয়, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ও আর্থিক অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে কর এড়ানোর উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে অর্থ ভাগ বা অন্যের নামে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রযোজ্য আইন ও করবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিনিয়োগকারীদের উচিত, সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের ও পরিবারের সদস্যদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা সাজানো।
৩. টিআইএন ও আয়কর সংক্রান্ত নিয়ম না জানলে কমতে পারে প্রকৃত আয়
সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া মুনাফার ক্ষেত্রে উৎসে কর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন, আয়কর রিটার্ন দাখিলের অবস্থা এবং বিনিয়োগকারীর প্রযোজ্য কর-পরিচিতি অনুযায়ী উৎসে করের হার ভিন্ন হতে পারে।
এখানে ভুল ধারণা থাকলে বিনিয়োগকারী হাতে পাওয়া প্রকৃত মুনাফা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন।
অনেকেই শুধু ঘোষিত মুনাফার হার হিসাব করেন। কিন্তু মুনাফা থেকে উৎসে কর বা প্রযোজ্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত আয় কত দাঁড়াবে, সেটিও আগে থেকে হিসাব করা জরুরি।
সঞ্চয়পত্র কেনার আগে তাই কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—
- বৈধ টিআইএন রয়েছে কি না;
- আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি না;
- উৎসে করের বর্তমান হার কত;
- মুনাফা থেকে মোট কত টাকা কর্তন হতে পারে;
- বিনিয়োগের তথ্য আয়কর রিটার্নে কীভাবে দেখাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, করসংক্রান্ত হার ও নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
৪. নিজের প্রয়োজন না বুঝে ভুল সঞ্চয়পত্র বেছে নেওয়া
সব সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পাওয়ার পদ্ধতি এক নয়। কোনো স্কিমে নিয়মিত নির্দিষ্ট সময় পরপর মুনাফা পাওয়া যায়, আবার কোনো স্কিমে মেয়াদ ও শর্ত অনুযায়ী ভিন্নভাবে অর্থ পরিশোধ করা হয়।
এ কারণে শুধু মুনাফার হার বেশি দেখেই স্কিম নির্বাচন করা উচিত নয়।
প্রথমে বিনিয়োগকারীকে নিজের প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে।
যাদের প্রতি মাসে আয় প্রয়োজন
অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, গৃহিণী বা নিয়মিত পারিবারিক খরচের জন্য বিনিয়োগের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিয়মিত মুনাফা প্রদানকারী স্কিম বেশি উপযোগী হতে পারে।
যাদের তিন মাস পরপর অর্থ প্রয়োজন
কিছু বিনিয়োগকারী মাসিক আয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বিরতিতে তুলনামূলক বড় অঙ্কের অর্থ পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের জন্য ত্রৈমাসিক বা নির্ধারিত সময় অন্তর মুনাফা প্রদানকারী বিনিয়োগ পরিকল্পনা উপযোগী হতে পারে।
যাদের তাৎক্ষণিক আয়ের প্রয়োজন নেই
যাদের নিয়মিত মুনাফার অর্থ খরচ করার প্রয়োজন নেই এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য রয়েছে, তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে।
তাই সঞ্চয়পত্র কেনার আগে নিজের কাছে প্রশ্ন রাখতে হবে—
মুনাফার টাকা কি প্রতি মাসে প্রয়োজন? তিন মাস পরপর প্রয়োজন? নাকি দীর্ঘমেয়াদে মূলধন ও মুনাফা নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর না জেনে স্কিম নির্বাচন করলে পরবর্তীতে আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে বিনিয়োগের মিল নাও থাকতে পারে।
৫. সব সঞ্চয় এক খাতে রাখবেন না
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার বহুল পরিচিত একটি নীতি হলো—সব ডিম এক ঝুড়িতে না রাখা।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতের সব সঞ্চয় একটি মাত্র বিনিয়োগ খাতে রাখা আর্থিকভাবে সব সময় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নয়।
সঞ্চয়পত্র নিরাপদ বিনিয়োগের একটি মাধ্যম হলেও ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনায় তারল্য, সময়কাল এবং ঝুঁকির ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
একটি কার্যকর পরিকল্পনায় অর্থকে সাধারণভাবে তিন ভাগে বিবেচনা করা যেতে পারে—
স্বল্পমেয়াদি তহবিল
জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা যাবে—এমন নগদ বা সহজে উত্তোলনযোগ্য অর্থ।
মধ্যমেয়াদি বিনিয়োগ
আগামী কয়েক বছরের সম্ভাব্য প্রয়োজন, যেমন সন্তানের শিক্ষা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা বড় কোনো পারিবারিক ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত অর্থ।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ
অবসর, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বা দীর্ঘ সময়ের আর্থিক লক্ষ্য পূরণের জন্য রাখা অর্থ।
সব অর্থ সঞ্চয়পত্রে রাখলে জরুরি সময়ে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিতে পারে। আবার সব টাকা শুধু ব্যাংক হিসাবে রাখলে দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
সুতরাং ব্যক্তিগত প্রয়োজন, ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে ভারসাম্যপূর্ণ পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সঞ্চয়পত্র কেনার আগে যে হিসাব করবেন
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিনিয়োগকারীদের অন্তত পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার করা উচিত—
প্রথম প্রশ্ন: এই টাকা আগামী কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে কি?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা পর্যাপ্ত নগদ অর্থ আছে কি?
তৃতীয় প্রশ্ন: বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী কোন মুনাফার স্তর প্রযোজ্য হবে?
চতুর্থ প্রশ্ন: উৎসে কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর্তন বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত মুনাফা কত থাকবে?
পঞ্চম প্রশ্ন: নিয়মিত মাসিক, ত্রৈমাসিক নাকি অন্য সময়সূচিতে মুনাফা প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: মুনাফা নয়, আগে দেখুন তারল্য
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু বেশি মুনাফার হার দেখলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ কোনো বিনিয়োগে অর্থ আটকে গেলে জরুরি সময়ে ঋণ নিতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া অতিরিক্ত মুনাফার সুবিধা অনেকটাই কমে যেতে পারে।
তাই বিনিয়োগের আগে নিজের মাসিক ব্যয়, জরুরি তহবিল, ভবিষ্যৎ দায়দেনা, চিকিৎসা ব্যয়ের সম্ভাবনা এবং পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত।
শেষ কথা
সঞ্চয়পত্র নিরাপদ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে এটিকে পুরো আর্থিক পরিকল্পনার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
জরুরি প্রয়োজনে প্রয়োজন হতে পারে এমন টাকা দীর্ঘমেয়াদে আটকে না রাখা, বিনিয়োগের ধাপ ও সীমা বোঝা, করসংক্রান্ত নিয়ম যাচাই করা, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক স্কিম নির্বাচন করা এবং সব সঞ্চয় এক খাতে না রাখাই হতে পারে সচেতন বিনিয়োগের মূল কৌশল।
তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার, বিনিয়োগসীমা, উৎসে কর ও অন্যান্য নিয়ম পরিবর্তনশীল হওয়ায় বিনিয়োগের আগে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালা যাচাই করা জরুরি।



