নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

মাতৃত্বকালীন ছুটি কত দিন, কবে থেকে নেওয়া যাবে—শিক্ষকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি

মাতৃত্বকালীন ছুটি সন্তান প্রসবের কত মাস আগে থেকে নেওয়া যাবে, ছুটির হিসাব কি শুক্রবার ও শনিবারসহ ১৮০ দিন হবে, আর ছুটি শেষে কোথায় যোগদান করতে হবে—এসব প্রশ্ন নিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন চাকরিজীবীর মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক চাকরিজীবীর করা এমন প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি মোট ১৮০ দিন, আবার কেউ বলেছেন এটি ছয় মাস। অন্যদিকে কেউ কেউ শ্রম আইন অনুযায়ী ১২০ দিনের কথাও উল্লেখ করেছেন। ফলে চাকরির ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী সঠিক নিয়ম জেনে ছুটি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

প্রসবের কত আগে থেকে ছুটি নেওয়া যাবে?

আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজনের দাবি, সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের আগে থেকেই মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীর শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রসবজনিত ঝুঁকি বিবেচনায় অনেকেই নির্ধারিত প্রসবের কয়েক দিন বা কিছু সময় আগে ছুটি গ্রহণ করেন।

তবে ছুটি গর্ভধারণের পর যেকোনো দিন থেকে নেওয়া যাবে কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট চাকরির বিধিমালা, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি আদেশের শর্তের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই শুধু প্রচলিত অভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি।

ছুটি কি ১৮০ দিন, নাকি ছয় মাস?

এ প্রশ্নেও দেখা গেছে ভিন্ন মত। কয়েকজন মন্তব্যকারী বলেছেন, ছুটি ১৮০ দিন এবং এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনও গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে। অন্যরা বলেছেন, ছুটি ছয় মাস, যা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী গণনা করা উচিত।

বাস্তবে ‘ছয় মাস’ এবং ‘১৮০ দিন’ সব ক্ষেত্রে একই অর্থ বহন করে না। কারণ কোনো মাস ২৮, ২৯, ৩০ বা ৩১ দিনের হতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ বা চাকরির বিধিতে ছুটির মেয়াদ যেভাবে নির্ধারণ করা আছে, সেই ভাষা অনুযায়ী হিসাব করাই গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্যকে চূড়ান্ত প্রশাসনিক বা আইনগত নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুক্রবার ও শনিবার কি ছুটির মধ্যে পড়বে?

সাধারণভাবে অনুমোদিত ছুটি অবিচ্ছিন্ন ছুটি হিসেবে মঞ্জুর হলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনও এর মধ্যে গণনা হতে পারে। তবে এটি ছুটির ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধির ওপর নির্ভরশীল।

তাই আবেদন করার সময় ছুটির শুরুর তারিখ ও শেষের তারিখ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ছুটি শেষে উপজেলায়, নাকি বিদ্যালয়ে যোগদান?

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে কেন্দ্র করে আলোচনায় কয়েকজন জানিয়েছেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে সাধারণত শিক্ষককে নিজ কর্মস্থল বা বিদ্যালয়ে যোগদান করতে হয়। অর্থাৎ উপজেলা কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি যোগদান করার নিয়ম সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

তবে কর্মস্থল, নিয়ন্ত্রণকারী দপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপজেলা বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

একজন মন্তব্যকারী জানিয়েছেন, ছুটি শেষে প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত যোগদানপত্র দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ এবং সার্ভিস রেকর্ড হালনাগাদের বিষয়টি নিশ্চিত করা উচিত।

ফিটনেস সনদ লাগবে কি?

কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ ছুটি শেষে কাজে যোগদানের সময় চিকিৎসকের ফিটনেস সনদ চাওয়া হতে পারে। তবে সব চাকরি বা সব দপ্তরে একই নিয়ম প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে জটিল প্রসব, অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ও অফিসের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।

শ্রম আইন ও সরকারি চাকরির বিধিমালা এক নয়

আলোচনায় একজন শ্রম আইন অনুযায়ী ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে শ্রম আইনের বিধান এবং সরকারি কর্মচারী বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য চাকরি বিধিমালা এক বিষয় নয়

ফলে একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর ক্ষেত্রে যে নিয়ম প্রযোজ্য, সরকারি চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে সেটি হুবহু প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

কী করবেন?

মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে—

  • নিজ দপ্তরের সর্বশেষ ছুটির বিধিমালা যাচাই করতে হবে;
  • প্রধান শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে কথা বলতে হবে;
  • উপজেলা শিক্ষা অফিস বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত বা নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা নিতে হবে;
  • ছুটির আবেদনপত্রে শুরুর ও শেষের তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে;
  • প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় মেডিকেল কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।

শেষ কথা

মাতৃত্বকালীন ছুটি একজন কর্মজীবী মায়ের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। তবে ১৮০ দিন, ছয় মাস, প্রসবের কত আগে ছুটি শুরু করা যাবে এবং ছুটি শেষে কোথায় যোগদান করতে হবে—এসব বিষয়ে চাকরির ধরন ও প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ সরকারি আদেশ ও বিধিমালা যাচাই করা সবচেয়ে নিরাপদ

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *