ইত্যাদি । বিবিধ । ক্যাটাগরী বিহীন তথ্য

হিন্দু বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে এক পুত্রের সমান অংশ পাবেন, তবে মালিকানা হবে সীমিত

স্বামীর মৃত্যুর পর হিন্দু বিধবা স্ত্রী তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে কতটুকু অধিকার পাবেন—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের আলোচনা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, হিন্দু বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে একজন জীবিত পুত্রের সমান অংশের অধিকারী। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ বক্তব্যের আইনগত ভিত্তি রয়েছে। তবে এর সঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে—বিধবার পাওয়া স্বত্ব পূর্ণ মালিকানা নয়; এটি ‘Hindu Woman’s Estate’ নামে সীমিত স্বত্ব।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো Hindu Women’s Rights to Property Act, 1937। আইনটির ২ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো হিন্দু ব্যক্তি উইল না করে মারা গেলে (intestate) এবং বিধবা স্ত্রী রেখে গেলে ৩ ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে। আইনটি বাংলাদেশজুড়ে প্রযোজ্য।

বিধবার অংশ কতটুকু?

আইনের ৩(১) ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দায়ভাগ মতাবলম্বী কোনো হিন্দু ব্যক্তি উইল না করে মারা গেলে এবং সম্পত্তি রেখে গেলে, তাঁর বিধবা স্ত্রী একজন পুত্র যে অংশ পেতেন, সেই একই অংশের অধিকারী হবেন। একাধিক বিধবা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে একজন পুত্রের সমান অংশ পাবেন।

অর্থাৎ, শুধু নারী হওয়ার কারণে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়া যাবে—এমন ধারণা এই আইনের বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একটি সহজ উদাহরণ

ধরা যাক, একজন হিন্দু ব্যক্তি কোনো কার্যকর উইল না করে মারা গেলেন। তাঁর উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি রয়েছে ৩০ লাখ টাকা এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে রয়েছেন—

  • ১ জন বিধবা স্ত্রী
  • ১ জন জীবিত পুত্র

এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধানের অধীনে বিধবা স্ত্রী একজন পুত্রের সমান অংশের অধিকারী হবেন। সরল উদাহরণ হিসেবে সম্পত্তি দুই সমান অংশে বিভক্ত হলে প্রত্যেকের অংশ হবে ১৫ লাখ টাকা।

তবে এখানেই শেষ নয়। বিধবার ১৫ লাখ টাকার অংশকে পুত্রের অংশের মতো পূর্ণ ও অবাধ মালিকানা হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না।

‘সমান অংশ’ মানেই ‘পূর্ণ মালিকানা’ নয়

আইনের ৩(৩) ধারায় বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই ধারার অধীনে বিধবার কাছে যে স্বত্ব আসবে, তা হবে “limited interest known as a Hindu Woman’s estate”। একই সঙ্গে বিধবার পুরুষ মালিকের মতো partition বা সম্পত্তি বিভাজনের দাবি করার অধিকার থাকবে। Laws of Bangladesh

অর্থাৎ, বিধবার অধিকারকে দুইভাবে বুঝতে হবে—

প্রথমত: উত্তরাধিকার অংশের দিক থেকে তিনি একজন পুত্রের সমান অংশ পেতে পারেন।
দ্বিতীয়ত: সেই অংশের ওপর তাঁর স্বত্ব আইনগতভাবে সীমিত।

এই কারণে ‘বিধবা স্ত্রী এক পুত্রের সমান সম্পত্তি পাবেন’ এবং ‘বিধবা স্ত্রী পুত্রের মতো সম্পত্তির পূর্ণ মালিক হয়ে যাবেন’—এই দুটি বক্তব্য এক নয়।

বিধবা কি সম্পত্তি ভাগ চাইতে পারবেন?

হ্যাঁ। এটি আইনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৩(৩) ধারায় বিধবার স্বত্বকে সীমিত বলা হলেও একই সঙ্গে তাঁকে পুরুষ মালিকের মতো partition দাবি করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে বিধবা স্ত্রী চাইলে তাঁর প্রাপ্য অংশ পৃথক করার জন্য আইনগতভাবে দাবি তুলতে পারেন।

তাই বিধবা স্ত্রীর কোনো উত্তরাধিকার অধিকার নেই বা তিনি কেবল সম্পত্তি ভোগ করবেন—এমন সরল ধারণাও সঠিক নয়।

একাধিক বিধবা থাকলে কী হবে?

আইনে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির একাধিক বিধবা থাকলে তারা প্রত্যেকে একজন করে পুত্রের সমান অংশ পাবেন—বিষয়টি এমন নয়। বরং সব বিধবা সম্মিলিতভাবে একজন পুত্রের সমান অংশ পাবেন।

অর্থাৎ, দুইজন বিধবা থাকলে তাদের সম্মিলিত অধিকার একজন পুত্রের অংশের সমান হবে; এরপর সেই অংশ তাদের মধ্যে আইন অনুযায়ী ভাগ হবে।

মৃত পুত্রের বিধবার জন্যও রয়েছে বিশেষ বিধান

আইনের ৩(১)-এর proviso অংশেও গুরুত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তির আগে মারা যাওয়া পুত্রের বিধবা স্ত্রী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পুত্রের মতো উত্তরাধিকার পাবেন। যদি ওই মৃত পুত্রের কোনো জীবিত পুত্র না থাকে, তাহলে তাঁর বিধবার উত্তরাধিকার একভাবে নির্ধারিত হবে; আর জীবিত পুত্র বা পুত্রের পুত্র থাকলে বিধানটি সে অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে।

একই ধরনের বিধান আগে মারা যাওয়া পুত্রের আগে মারা যাওয়া পুত্রের বিধবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

যৌথ পরিবারের সম্পত্তির ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান রয়েছে

আইনের ৩(২) ধারায় হিন্দু যৌথ পরিবারের সম্পত্তির বিষয়ে আলাদা বিধান রাখা হয়েছে। দায়ভাগ মতাবলম্বী নয়—এমন কোনো হিন্দু ব্যক্তি বা প্রচলিত প্রথার অধীনে থাকা ব্যক্তির মৃত্যুর সময় যদি যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে তাঁর কোনো স্বার্থ থাকে, তাহলে তাঁর বিধবা স্ত্রী নির্দিষ্ট শর্তে স্বামীর যে স্বার্থ ছিল, সেই একই স্বার্থের অধিকারী হবেন। তবে এটিও ৩(৩)-এর সীমিত স্বত্বের অধীন।

সব সম্পত্তির ক্ষেত্রে কি একই নিয়ম?

না। এখানেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

আইনের ৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে, কিছু বিশেষ ধরনের সম্পত্তিতে এই ধারার বিধান প্রযোজ্য হবে না। যেমন—যে সম্পত্তি কোনো প্রথাগত বা অন্য কোনো উত্তরাধিকার নিয়ম অনুযায়ী একক উত্তরাধিকারীর কাছে যাওয়ার কথা, অথবা যে সম্পত্তির ক্ষেত্রে Succession Act, 1925 প্রযোজ্য, সেসব ক্ষেত্রে এই ধারার বিধান প্রযোজ্য নয়।

তাই কোনো নির্দিষ্ট জমি বা বাড়ির ক্ষেত্রে বিধবার অংশ নির্ধারণ করতে হলে শুধু ‘বিধবা স্ত্রী একজন পুত্রের সমান অংশ পাবেন’—এই একটি বাক্যের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।

স্বামী উইল করে গেলে পরিস্থিতি কী হবে?

১৯৩৭ সালের আইনের ২ ধারার বিধান মূলত এমন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যখন হিন্দু ব্যক্তি উইল না করে মারা যান। অর্থাৎ intestate death-এর ক্ষেত্রে এই আইনের ৩ ধারার উত্তরাধিকার বিধান কার্যকর হয়।

আইনের ৫ ধারায় ‘die intestate’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোনো সম্পত্তির বিষয়ে কার্যকরভাবে গ্রহণযোগ্য testamentary disposition বা উইল করা থাকলে সেই সম্পত্তির ক্ষেত্রে তাকে intestate সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে না।

ফলে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় স্বামী উইল করে গেছেন কি না—এটি উত্তরাধিকার নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিধবা কি ইচ্ছামতো সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

আইনে বিধবার স্বত্বকে সরাসরি limited interest বা সীমিত স্বত্ব বলা হয়েছে। ফলে শুধু ‘একজন পুত্রের সমান অংশ’ পেয়েছেন—এই যুক্তিতে তাঁকে পুত্রের মতো পূর্ণ ও অবাধ মালিক ধরে নিয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতে সম্পত্তি বিক্রির অধিকার আছে বলে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

কোনো বিধবা নির্দিষ্ট জমি বিক্রি, দান বা অন্যভাবে হস্তান্তর করতে পারবেন কি না—তা নির্ভর করতে পারে সম্পত্তির প্রকৃতি, তাঁর স্বত্বের ধরন, হস্তান্তরের কারণ, প্রযোজ্য আইন এবং সংশ্লিষ্ট দলিল ও পরিস্থিতির ওপর।

তাই ‘বিধবা এক পুত্রের সমান অংশ পাবেন’—এই তথ্য থেকে সরাসরি ‘বিধবা যেকোনো সময় সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবেন’—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবিটির সঠিক ব্যাখ্যা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যটি তাই কিছুটা সংশোধন করে এভাবে বলা অধিক নির্ভুল—

বাংলাদেশে Hindu Women’s Rights to Property Act, 1937-এর ৩(১) ধারার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো হিন্দু ব্যক্তি উইল ছাড়া মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তিতে একজন পুত্রের সমান অংশের অধিকারী হতে পারেন। তবে ৩(৩) ধারায় বিধবার সেই স্বত্বকে ‘Hindu Woman’s Estate’ হিসেবে সীমিত করা হয়েছে এবং তাঁকে পুরুষ মালিকের মতো সম্পত্তি বিভাজনের দাবি করার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

বিষয়আইনগত অবস্থান
বিধবা স্ত্রী কি স্বামীর সম্পত্তিতে অংশ পান?নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হ্যাঁ
অংশ কত?একজন পুত্রের সমান
একাধিক বিধবা হলেসম্মিলিতভাবে একজন পুত্রের সমান অংশ
বিধবার স্বত্বLimited interest / Hindu Woman’s Estate
সম্পত্তি ভাগ দাবি করতে পারেন?হ্যাঁ
স্বামী উইল ছাড়া মারা গেলে৩ ধারার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে
কার্যকর উইল থাকলেউইলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
সব সম্পত্তিতে একই নিয়ম?না, আইনে ব্যতিক্রম রয়েছে
পুত্রের মতো পূর্ণ মালিকানা?না—আইনে স্বত্ব সীমিত হিসেবে বর্ণিত

শেষ কথা

হিন্দু বিধবা স্ত্রীর স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অংশের পরিমাণ এবং মালিকানার প্রকৃতি এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের ১৯৩৭ সালের আইনে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিধবা স্ত্রীকে একজন পুত্রের সমান অংশ দেওয়া হলেও সেই স্বত্বকে আইন একই সঙ্গে সীমিত স্বত্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

তাই কোনো বিধবা স্ত্রী স্বামীর রেখে যাওয়া জমি, বাড়ি বা অন্যান্য সম্পত্তির কতটুকু পাবেন, সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার পরিস্থিতি, উইল আছে কি না, সম্পত্তিটি পৃথক না যৌথ, প্রযোজ্য হিন্দু আইন ও সংশ্লিষ্ট দলিল—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট কোনো জমি বা সম্পত্তি বিক্রির আগে সংশ্লিষ্ট দলিল যাচাই করে আইনজীবী বা অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *