বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি । উচ্চতর গ্রেড

৯ম পে-স্কেলে উচ্চতর গ্রেডের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম ২০২৬: ৮ বছর পর প্রথম, ৬ বছর পর দ্বিতীয়—ব্লকড পদে তৃতীয় গ্রেডের সুযোগ

সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি ছাড়াই উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়ম নিয়ে নতুন বেতন কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে। ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর উচ্চতর গ্রেড-সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একই পদে আট বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর প্রথম উচ্চতর গ্রেড এবং প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর আরও ছয় বছর চাকরি করার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্লকড ও পদোন্নতিবিহীন পদের জন্য তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের বিশেষ বিধানও রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এস. আর. ও. নং ৩৪৭-আইন/২০২৬-এর মাধ্যমে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ প্রকাশিত হয়েছে। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটেও ১৯ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত নোটিশ প্রকাশ করা হয়। ফলে উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা, চাকরির মেয়াদ গণনা এবং আগের বেতন সুবিধার প্রভাব বুঝতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য গেজেটের সংশ্লিষ্ট বিধান জানা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথম উচ্চতর গ্রেড: একই পদে ৮ বছর পূর্ণ হলে কী হবে?

নতুন আদেশের বিধান অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ করলে এবং তাঁর চাকরি সন্তোষজনক হলে নবম বছরে পদের মূল বেতনস্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন। তবে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া পদোন্নতি হিসেবে গণ্য হবে না।

এখানে চাকরির মেয়াদ ছাড়াও কর্মচারীর স্থায়ী চাকরির অবস্থা, একই পদে কর্মরত থাকার ধারাবাহিকতা, চাকরির সন্তোষজনক অবস্থা এবং পূর্বে পাওয়া আর্থিক সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

১ জুলাই ২০২৬-এর আগে ৮ বছর পূর্ণ হলে

গেজেটের বিশেষ বিধান অনুযায়ী, যেসব স্থায়ী কর্মচারীর ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু দশ বছর পূর্ণ হয়নি, তাঁরা নির্ধারিত শর্তে ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

এ বিধান পুরোনো বেতন কাঠামোর অধীনে দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রত্যেক কর্মচারীর চাকরির ইতিহাস ও পূর্বের সুবিধা যাচাই করে প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড: প্রথম গ্রেডের পর আরও ৬ বছর

প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পরও কোনো স্থায়ী কর্মচারী একই পদে পদোন্নতি ছাড়া পরবর্তী ছয় বছর চাকরি করলে এবং তাঁর চাকরি সন্তোষজনক থাকলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সহজভাবে বললে, প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় বছরের মেয়াদ গণনা করতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে সপ্তম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারী ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলেন। এরপর তিনি একই পদে পদোন্নতি ছাড়া আরও ছয় বছর চাকরি করলেন। অন্য সব শর্ত পূরণ হলে তাঁর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ধারণে এই মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে এটি কেবল নিয়ম বোঝানোর উদাহরণ। ব্যক্তিবিশেষের প্রকৃত প্রাপ্যতার তারিখ নির্ধারণে গেজেটের পূর্ণ বিধান, চাকরির রেকর্ড ও প্রযোজ্য প্রশাসনিক আদেশ অনুসরণ করতে হবে।

আগে একটি উচ্চতর স্কেল পাওয়া থাকলে কী হবে?

কোনো কর্মচারী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বা তার আগে একই পদে চাকরিকালীন মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে, পরবর্তী ছয় বছরের চাকরির মেয়াদ পূর্ণ এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ থাকতে পারে।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্ববর্তী সময়ের বকেয়া এবং নতুন বেতন নির্ধারণের সুবিধা এক বিষয় নয়। গেজেটের বিশেষ বিধানে বেতন নির্ধারণের সুবিধা ছাড়া ৩০ জুন ২০২৬ বা তার আগের কোনো বকেয়া প্রাপ্য না হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তাই কোনো কর্মচারী উচ্চতর গ্রেডের যোগ্য হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের সময়ের সব বকেয়া পাবেন—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

ব্লকড পদে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের নিয়ম

যেসব পদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ব্লকড হিসেবে ঘোষিত এবং যেসব পদে পদোন্নতির বিধান নেই, সেসব পদে কর্মরত কর্মচারীদের জন্য তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারী নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তারিখ থেকে আরও আট বছর চাকরি সম্পন্ন করলে নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।

তবে এই সুবিধা সব সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য নয়। পদটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্লকড হিসেবে ঘোষিত কি না, পদোন্নতির কোনো বিধান আছে কি না এবং কর্মচারী প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের শর্ত পূরণ করেছেন কি না—এসব যাচাই করতে হবে।

গেজেটে আরও উল্লেখ রয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের আগে এই বিশেষ বিধানের আওতায় তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড প্রদান করা হবে না।

একই পদে সর্বোচ্চ কতবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে?

উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে সুবিধার সর্বোচ্চ সীমা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ বিধানে একই পদে কর্মজীবনে নির্ধারিত আর্থিক সুবিধা দুইবারের বেশি পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ব্লকড ও পদোন্নতিবিহীন পদের জন্য তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের পৃথক বিশেষ বিধান রয়েছে।

এ কারণে সাধারণ কর্মচারীর ক্ষেত্রে দুইবার উচ্চতর গ্রেডের নিয়ম এবং নির্দিষ্ট ব্লকড পদের ক্ষেত্রে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের বিধান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

আগের সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের প্রভাব

পুরোনো বেতন কাঠামোর অধীনে সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া থাকলে নতুন আদেশের অধীনে সুবিধা নির্ধারণের সময় সেগুলোর প্রভাব বিবেচনা করা হবে।

একই পদে পূর্বের বেতন কাঠামোর অধীনে দুই বা ততোধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়া থাকলে নতুন কাঠামোয় একই পদে আবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

অন্যদিকে, আগে মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে নির্ধারিত সময় ও অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ থাকতে পারে।

তাই শুধু বর্তমান মূল বেতন বা বর্তমান গ্রেড দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। নিয়োগের তারিখ, পদ পরিবর্তনের ইতিহাস, পূর্বে পাওয়া আর্থিক সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট বিধান একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

উচ্চতর গ্রেড কি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়?

গেজেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের কথা উল্লেখ থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে কোনো প্রশাসনিক যাচাই ছাড়াই সবার বেতন নিজে থেকেই পরিবর্তিত হবে।

প্রদত্ত নির্দেশনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির অনুমোদনের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব কিংবা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অফিস আদেশ জারি করে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতে পারে।

এ কারণে কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ, স্থায়ীকরণ, পূর্বের বেতন সুবিধা এবং সন্তোষজনক চাকরির তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চতর গ্রেড পেতে কর্মচারীদের করণীয়

উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকারি কর্মচারীদের কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।

১. একই পদে চাকরির মেয়াদ সঠিকভাবে গণনা করুন।

২. স্থায়ীকরণ-সংক্রান্ত আদেশ ও চাকরির রেকর্ড যাচাই করুন।

৩. আগে সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন কি না, নিশ্চিত করুন।

৪. আপনার পদ ব্লকড বা পদোন্নতিবিহীন পদ হিসেবে ঘোষিত কি না, যাচাই করুন।

৫. সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা হিসাব শাখার মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করুন।

৬. অনুমোদিত আদেশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বেতন পুনর্নির্ধারণ সম্পন্ন করুন।

সরকারি গেজেট কোথায় দেখবেন?

উচ্চতর গ্রেডের নিয়ম ও প্রযোজ্য শর্ত যাচাই করতে অর্থ বিভাগের সরকারি নোটিশ এবং বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ের গেজেট তালিকা দেখুন।

মূল গেজেটের পূর্ণ পাঠ অনুসরণ করাই উচ্চতর গ্রেডের প্রাপ্যতা নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

শেষ কথা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ উচ্চতর গ্রেডের নিয়ম সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ ও আর্থিক সুবিধা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ ক্ষেত্রে একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে প্রথম উচ্চতর গ্রেড এবং প্রথম গ্রেড পাওয়ার পর আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট ব্লকড ও পদোন্নতিবিহীন পদের ক্ষেত্রে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের বিশেষ বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হওয়া মানেই প্রত্যেক কর্মচারীর জন্য একই তারিখে একই সুবিধা নিশ্চিত হওয়া নয়। পূর্বে পাওয়া আর্থিক সুবিধা, চাকরির সন্তোষজনক অবস্থা, পদের ধরন এবং গেজেটের বিশেষ শর্ত যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *