অবহেলায় গুনতে হতে পারে জরিমানা ২০২৬ । ৩১ মার্চের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলের তাগিদ দিচ্ছে এনবিআর?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ২০২৫-২০২৬ কর বছরের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন (eReturn) দাখিলের সময়সীমা মনে করিয়ে দিয়ে করদাতাদের মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা (SMS) পাঠানো শুরু করেছে। আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানাসহ আইনি জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন এই জরুরি বার্তা?
সম্প্রতি এনবিআর তাদের অটোমেশন সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন থেকে করদাতাদের ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের তথ্যের সাথে রিটার্ন দাখিলের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তথ্যের গরমিল বা সময়মতো রিটার্ন জমা না দেওয়ার বিষয়টি এখন সহজেই শনাক্তযোগ্য।
কাদের জন্য এই নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ?
আয়কর আইন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা ট্যাকসেস বার এসোসিয়েশনের সদস্য মোঃ মাসুদ রানা এই সচেতনতামূলক বার্তার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
নতুন ও পুরাতন TINধারী: যাদের কর শনাক্তকরণ নম্বর (TIN) রয়েছে কিন্তু এখনো ২০২৫-২০২৬ কর বছরের রিটার্ন জমা দেননি, তাদের জন্য এই সময়সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে বিলম্ব ফি ও জরিমানা আরোপ হতে পারে।
যারা ইতোমধ্যে জমা দিয়েছেন: অনেক ক্ষেত্রে সিস্টেম থেকে অটোমেটেড বার্তা সবার কাছেই চলে যায়। যারা ইতোমধ্যে সফলভাবে রিটার্ন দাখিল করেছেন, তাদের নতুন করে উদ্বেগের কারণ নেই। তবে প্রমাণ হিসেবে ‘Acknowledgement Receipt’ বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্রটি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পরামর্শ
‘মাসুদ এন্ড এসোসিয়েটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান মোঃ মাসুদ রানা জানান, “বর্তমানে এনবিআর-এর সিস্টেম অত্যন্ত আধুনিক। তাই করদাতাদের উচিত সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিয়ে রিটার্ন দাখিল করা। কোনো তথ্য গোপন করলে পরবর্তীতে আইনি জটিলতা বা অডিটের মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকে।”
করণীয় কী?
১. দ্রুত আপনার আয় ও ব্যয়ের হিসাব সম্পন্ন করুন। ২. এনবিআর-এর অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে eReturn দাখিল করুন। ৩. কোনো জটিলতা দেখা দিলে অভিজ্ঞ কর আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
আয়কর বিষয়ক যেকোনো তথ্যের জন্য বা রিটার্ন দাখিলে সহায়তার প্রয়োজন হলে করদাতারা সরাসরি পেশাদার আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর প্রদান করে দেশের উন্নয়নে শরিক হওয়া এবং আইনি ঝামেলামুক্ত থাকাই সচেতন নাগরিকের পরিচয়।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করার শাস্তি কি?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী বেশ কিছু আর্থিক জরিমানা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। নিচে এর প্রধান শাস্তি ও প্রভাবগুলো তুলে ধরা হলো:
১. এককালীন জরিমানা (Penalty)
যদি কোনো করদাতা নির্ধারিত সময়ের (ট্যাক্স ডে) মধ্যে রিটার্ন জমা না দেন, তবে উপ-কর কমিশনার তার ওপর জরিমানা আরোপ করতে পারেন। এই জরিমানার পরিমাণ সাধারণত:
সর্বশেষ কর নির্ধারণী অনুযায়ী প্রদেয় করের ১০% (তবে এটি সর্বনিম্ন ১,০০০ টাকার কম হবে না)।
যদি দেরি চলতেই থাকে, তবে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা করে জরিমানা যুক্ত হতে পারে।
পুরানো করদাতাদের ক্ষেত্রে: জরিমানা পূর্ববর্তী বছরের করের ৫০% এর বেশি হবে না। তবে নতুন করদাতার ক্ষেত্রে এই জরিমানা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
২. বিলম্ব সুদ (Delay Interest)
জরিমানা ছাড়াও, নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে বকেয়া করের ওপর প্রতি মাসে ২% হারে বিলম্ব সুদ (Delay Interest) প্রদান করতে হয়। মাসের অংশবিশেষকেও পূর্ণ মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, আপনি যত দেরি করবেন, আপনার সুদের পরিমাণ তত বাড়তে থাকবে।
৩. কর রেয়াত সুবিধা হারানো
সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হলো কর রেয়াত (Tax Rebate)। সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে সরকার অনুমোদিত বিনিয়োগের (যেমন: সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমা বা ডিপিএস) ওপর যে ১৫% কর রেয়াত পাওয়া যায়, সেই সুবিধাটি আপনি ভোগ করতে পারবেন না। এর ফলে আপনাকে অনেক বেশি কর পরিশোধ করতে হতে পারে।
৪. সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৩টি সরকারি ও বেসরকারি সেবা পাওয়ার জন্য রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (Acknowledgment Receipt) বাধ্যতামূলক। সময়মতো রিটার্ন না দিলে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে:
ব্যাংক ঋণ অনুমোদন।
৫ লক্ষ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কেনা বা পোস্টাল সেভিংস একাউন্ট খোলা।
ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন।
৫ লক্ষ টাকার বেশি ব্যাংক ক্রেডিট ব্যালেন্স রাখা।
গাড়ি কেনা বা বাড়ির নকশা অনুমোদন।
৫. অডিট বা অধিকতর স্ক্রুটিনি
দেরিতে রিটার্ন জমা দিলে কর কর্মকর্তার নজরদারিতে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আপনার ফাইলটি সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বাড়তি তদন্ত বা অডিট (Audit) এর জন্য নির্বাচিত হতে পারে।
পরামর্শ: যদি বিশেষ কোনো কারণে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই উপ-কর কমিশনারের কাছে সময় বাড়ানোর জন্য লিখিত আবেদন করা উচিত। তবে মনে রাখবেন, সময় বাড়ালেও আপনাকে বিলম্ব সুদ (২%) থেকে রেহাই দেওয়া হবে না, শুধুমাত্র এককালীন জরিমানা থেকে বাঁচতে পারেন।



