১১ বছর ধরে থমকে আছে পে-স্কেল, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সরকারি কর্মচারীরা
দেশে গত ১১ বছর ধরে নতুন কোনো জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে চরম সংকটে পড়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে দ্রুত ৯ম পে-স্কেল ঘোষণার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বনাম স্থির বেতন
সংগঠনটির আহ্বায়ক মো. আব্দুল মালেক এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সাধারণত একটি পে-স্কেল দিলে বাজারে দাম বাড়বে—এমন অজুহাত দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত এক দশকে পে-স্কেল না হলেও কি বাজারে পণ্যের দাম থেমে আছে? প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে, অথচ কর্মচারীদের বেতন সেই ২০১৫ সালের কাঠামোতেই আটকে আছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ১১ বছর ধরে বেতন না বাড়লেও জীবনযাত্রার প্রতিটি খাতের খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক কর্মচারী এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।
ঘোষিত নতুন কর্মসূচি
দাবি আদায়ে আজ ৫ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কল্যাণ সমিতি। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে:
৫-৯ এপ্রিল: দেশের প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান।
১০ এপ্রিল: উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি সমাবেশ ও শান্তিপূর্ণ আলোচনা সভা।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো
১. ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন: অবিলম্বে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে তা আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা।
২. মহার্ঘ ভাতা: পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে উচ্চহারে মহার্ঘ ভাতা প্রদান।
৩. বেতন বৈষম্য নিরসন: পূর্ববর্তী পে-স্কেলগুলোতে তৈরি হওয়া গ্রেড ও বেতন বৈষম্য দূর করা।
সরকারের প্রতি আহ্বান
আন্দোলনকারী নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে তারা ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছেন। তারা মনে করেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যদি দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে জীবনযাপন করতে না পারেন, তবে রাষ্ট্রীয় কাজে গতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে। তারা আশা প্রকাশ করছেন, প্রধানমন্ত্রী দ্রুত হস্তক্ষেপ করে এই মানবিক সংকটের সমাধান করবেন।
আজকের বৈঠকে সরকার কি সিদ্ধান্ত নিলো?
৫ এপ্রিল ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে আজকের বৈঠকের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো নিচে দেওয়া হলো:
আজকের প্রস্তুতিমূলক সভায় সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা না করা হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকেত পাওয়া গেছে। আজকের বৈঠকের মূল নির্যাস নিম্নরূপ:
১. মূল্যস্ফীতি সমন্বয় ভাতা (Inflation Adjustment Allowance)
বৈঠকে উপস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে একটি ‘উচ্চহারের মহার্ঘ ভাতা’ বা ‘মূল্যস্ফীতি সমন্বয় ভাতা’ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে সরকার। এটি আগামী বাজেটের আগেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২. ৫% বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পুনর্বিবেচনা
বর্তমানে প্রচলিত বার্ষিক ৫% চক্রবৃদ্ধি হারে বেতন বৃদ্ধির হারটি দ্রব্যমূল্যের বর্তমান বাজারের সাথে অসংগতিপূর্ণ বলে স্বীকার করা হয়েছে। আজকের আলোচনায় এই হার বাড়িয়ে ৮% থেকে ১০% করার একটি প্রস্তাবনা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
৩. গ্রেড বৈষম্য নিরসনে টেকনিক্যাল কমিটি
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের (১১-২০ গ্রেড) জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বেতন বৈষম্য দূর করতে একটি ‘স্পেশাল টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কমিটি আগামী ৯০ দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে।
৪. রেশন ব্যবস্থার প্রস্তাব
বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বল্পমূল্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘রেশন কার্ড’ চালুর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
৫. আগামী পদক্ষেপ
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, কর্মচারীদের স্মারকলিপি গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। তবে কল্যাণ সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ৯ম পে-স্কেলের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসবে, ততক্ষণ তাদের ঘোষিত কর্মসূচি (স্মারকলিপি প্রদান ও সমাবেশ) অব্যাহত থাকবে।
সংক্ষেপে: সরকার এখনই পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল ঘোষণা না দিলেও ‘মহার্ঘ ভাতা’ এবং ‘রেশন সুবিধা’র মাধ্যমে কর্মচারীদের ক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলনকারীরা পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেলের দাবিতে অনড় রয়েছেন।



