‘৫ পার্সেন্ট’ সিন্ডিকেটের জাঁতাকলে সৎ চাকরিজীবীরা : হিসাবরক্ষণ অফিসে টাকা ছাড়া ঘোরে না ফাইল
সরকারি চাকরিতে যোগদান থেকে শুরু করে অবসরে যাওয়া—পুরো কর্মজীবনে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সবচেয়ে বেশি যে দপ্তরের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো হিসাবরক্ষণ কার্যালয় বা এজি (Auditor General) অফিস। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই দপ্তরটি সাধারণ ও সৎ চাকরিজীবীদের জন্য এক চরম আতঙ্ক ও হয়রানির নাম। ভুক্তভোগীদের ভাষায়, “জীবনে কোনো লোক যদি সৎ পথে চাকরি পায়, তবে কর্মজীবনের প্রথম অসৎ ধাক্কাটি সে খাবে এই হিসাবরক্ষণ বা ট্রেজারি অফিসে।”
বৈধ বেতন বিল, বকেয়া (এরিয়ার), টিএ বিল কিংবা পেনশনের টাকা—নিজের কষ্টার্জিত পাওনা তুলতে গেলেও এখানে নির্দিষ্ট হারে ‘পার্সেন্টেজ’ দেওয়া এখন এক ‘সর্বজনীন নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। প্রশাসন বা সমাজভেদে এরা ‘৫% সিন্ডিকেট’ নামে সুপরিচিত।
প্রথম বেতনেই ‘মিষ্টি খাওয়ার’ বাধ্যবাধকতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, লবিং বা ঘুষ ছাড়া সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে যারা সরকারি চাকরিতে যোগদান করছেন, তাদের সততার দেয়ালে প্রথম আঘাতটি আসে এজি অফিস থেকে। প্রথম মাসের বেতন তুলতে গেলেই ‘মিষ্টি খাওয়ার বকশিশ’ বা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ দাবি করা হয়। এমনকি এক কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে বদলি হলে যে ‘লাস্ট পে সার্টিফিকেট’ বা এলপিসি (LPC) প্রয়োজন হয়, সেটি তুলতেও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা।
অনলাইনে বেতন বিল (iBAS++) সাবমিট করার আধুনিক নিয়ম চালু হলেও এই দুর্নীতির চাকা থামেনি। ভুক্তভোগীরা জানান, অনলাইনে বিল দেওয়ার পর সিস্টেমে নানাবিধ ভুয়া ‘অডিট আপত্তি’ বা টেকনিক্যাল ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখা হয়। যতক্ষণ না অফলাইনে বা আড়ালে টাকা পৌঁছাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই বিল পাস হয় না। ফলে ডিজিটাল পদ্ধতিও এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
পেনশনারদের কান্না: মৃত মানুষের টাকাতেও থাবা
সবচেয়ে অমানবিক চিত্র দেখা যায় পেনশনের ফাইল প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে। একজন সরকারি চাকরিজীবী সারা জীবন সততার সাথে দেশসেবা করার পর যখন অবসরে যান, তখন তার শেষ সম্বলটুকু প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও এজি অফিসের কর্মচারীরা অচল দেয়াল তুলে দাঁড়ায়।
এমনকি কোনো চাকরিজীবী মারা যাওয়ার পর তার অসহায় পরিবার যখন পারিবারিক পেনশনের জন্য আসে, সেখানেও চলে নির্মম দরকষাকষি। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল টেবিলে পড়ে থাকে, নানা কাগজপত্রের ভুল ধরা হয়। বাধ্য হয়ে চোখের জল মুছে মৃত ব্যক্তির স্বজনরা ঘুষের টাকা তুলে দেন অসাধু কর্মকর্তাদের হাতে।
কেন যুগ যুগ ধরে চলে এই নীরবতা?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন—যুগ যুগ ধরে এই অন্যায় সহ্য করা হচ্ছে কেন? কেন এর বিরুদ্ধে কোনো বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না? তথ্য বিশ্লেষণে এর প্রধান ৩টি কারণ সামনে এসেছে:
১. চাকরি হারানোর বা হয়রানির ভয়: একজন সরকারি চাকরিজীবী যদি এজি অফিসের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন বা অভিযোগ করেন, তবে তার পরবর্তী মাসের বেতন, পদোন্নতির বকেয়া বিল বা ভবিষ্যৎ তহবিল (GPF) থেকে টাকা তোলার ফাইলটি স্থায়ীভাবে আটকে দেওয়া হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্ল্যাকমেইলের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পান না। ২. তদন্তের নামে প্রহসন: “চোরকে দিয়ে চুরির তদন্ত করানোর” মতোই এজি অফিসের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে, তা তদন্ত করতে আসেন আরেকজন সমপর্যায়ের কর্মকর্তা। ফলে অধিকাংশ তদন্ত রিপোর্টই অপরাধীদের পক্ষে যায় এবং অভিযোগকারী উল্টো আরও বেশি হেনস্থার শিকার হন। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট: নিচু স্তরের অডিটর থেকে শুরু করে ওপরের কর্মকর্তা পর্যন্ত এই পার্সেন্টেজের টাকা ভাগ বাঁটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও হতাশা
ক্ষুব্ধ এক সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক বলেন,
“সরকারি সেবা নিতে যে অফিসেই যাবেন, সেখানেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। বৈধ টিএ বিল বা এরিয়ার বিল পাস করতে গেলে ৫% কেটে রাখতে চায়। এ দেশে জন্ম নেওয়াই যেন আমাদের মতো সৎ মানুষের জন্য একটা বড় পাপ।”
ডিজিটালাইজেশনের যুগেও এই ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দেশের সুশাসনকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সৎ চাকরিজীবীদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অনতিবিলম্বে এজি অফিসগুলোর কার্যক্রমে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হোক এবং প্রতিটি বিল পাসের প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বয়ংক্রিয় ও মানবিক হস্তক্ষেপমুক্ত করা হোক। অন্যথায়, সৎভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখা সরকারি কর্মচারীদের এই দীর্ঘশ্বাস ও ক্ষোভ একদিন পুরো ব্যবস্থার ওপর গণ-অবিশ্বাসের জন্ম দেবে।



