সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সরকারি হাসপাতালে যোগদান করেও হাজিরায় অনীহা : বিপাকে পড়ার আশঙ্কা, ক্ষোভ প্রকাশ সহকর্মীদের

সরকারি চাকরিতে যোগদান বা সংযুক্তি (Attachment) পাওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হলো কর্মস্থলে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। কিন্তু দেশের একটি সদর হাসপাতালে যোগদানের পর এক চিকিৎসকের হাজিরা খাতায় নাম না ওঠা বা বায়োমেট্রিকে রেজিষ্ট্রেশন না হওয়ার পরও নীরব থাকার ঘটনা সামনে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের এই অবস্থাতেই দিনের পর দিন অফিস করে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল বলছেন, এই ধরনের অবহেলা ওই কর্মকর্তার চাকরি জীবন, বেতন-ভাতা এবং পেনশন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

ঘটনাটি ঠিক কী?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এক সরকারি কর্মকর্তা বা চিকিৎসক সম্প্রতি একটি সদর হাসপাতালে সংযুক্তিতে যোগদান করেন। নিয়ম অনুযায়ী যোগদানের পরদিনই তার নাম হাজিরা খাতায় ওঠার কথা অথবা ডিজিটাল বায়োমেট্রিক সিস্টেমে তার আঙুলের ছাপ যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো হাজিরা খাতায় বা বায়োমেট্রিকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এমনকি হাজিরার নিয়মকানুন নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে কিছুই জানানো হয়নি।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, হাজিরার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা রেকর্ড না থাকা সত্ত্বেও ওই কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস করে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করলে সহকর্মী ও সচেতন নেটিজেনদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

সহকর্মী ও নেটিজেনদের তীব্র প্রতিক্রিয়া

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অন্যান্য কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই ওই চিকিৎসকের এই অসচেতনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

একজন সহকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,

“আপনি যেখানে কাজ করবেন, সেখানে হাজিরা খাতা বা বায়োমেট্রিক সিস্টেমে উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন—এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। অবিলম্বে আপনার অফিস প্রধানের সাথে কথা বলা উচিত।”

অন্য এক মন্তব্যকারী কিছুটা কটাক্ষ করে লিখেছেন,

“খাতায় যে হাজিরা দিতে হবে, এটা না বোঝার কিছু নেই। চিকিৎসকরা বড় কোনো আইনি পেঁচে না পড়লে অনেক সময় এসব প্রশাসনিক সাধারণ নিয়ম বুঝতে চান না। অফিসের হাজিরার নিয়ম সবার জন্য সমান। আপনার ক্ষেত্রে কেন আলাদা, সেটা এখনই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবগত করুন।”

কী কী প্রশাসনিক ও আইনি সমস্যা হতে পারে?

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী কর্মস্থলে হাজিরার লিখিত বা ডিজিটাল প্রমাণ না থাকলে একজন কর্মকর্তা চরম ঝুঁকিতে পড়েন। এর ফলে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:

  • বেতন-ভাতা বন্ধ হওয়া: হাজিরার রেকর্ড বা ‘অ্যাবসেন্ট স্টেটমেন্ট’ (Absentee Statement) ছাড়া প্রতি মাসের বেতন বিল পাস হওয়া অসম্ভব। ফলে ওই কর্মকর্তা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

  • অননুমোদিত অনুপস্থিতি (Absenteeism): সরকারি রেকর্ডে হাজিরা না থাকার অর্থ হলো তিনি কাগজে-কলমে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ চাইলে তাকে ‘অননুমোদিত অনুপস্থিত’ দেখিয়ে বিভাগীয় মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

  • সার্ভিস বুক ও পেনশনে জটিলতা: চাকরির এই সংযুক্তিকালীন সময়টি যদি হাজিরা খাতার মাধ্যমে প্রত্যয়িত না হয়, তবে পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ীকরণ, পদোন্নতি এবং পেনশনের সময় এই সময়কালটি গণনা করা নাও হতে পারে।

দ্রুত করণীয় কী?

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ওই কর্মকর্তার আর এক মুহূর্তও চুপ থাকা ঠিক হবে না। তার দ্রুত নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:

১. লিখিত আবেদন: অবিলম্বে হাসপাতাল বা অফিস প্রধান (সিভিল সার্জন বা তত্ত্বাবধায়ক) বরাবর লিখিতভাবে জানাতে হবে যে, তিনি অমুক তারিখে যোগদান করেছেন কিন্তু এখনও তার হাজিরা বা বায়োমেট্রিক সচল করা হয়নি। ২. যোগদানপত্রের কপি সংরক্ষণ: যোগদানের পর অফিস থেকে যে রিসিভ কপি বা স্মারক নম্বর দেওয়া হয়েছে, তা যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। ৩. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ: স্থানীয় প্রশাসন যদি বিষয়টি আমলে না নেয়, তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত অনুলিপি (CC) দিয়ে বিষয়টি রেকর্ডভুক্ত করে রাখতে হবে।

উপসংহার: সরকারি প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য ডিজিটাল বায়োমেট্রিক এবং হাজিরা খাতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সদর হাসপাতালের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এই ধরনের প্রশাসনিক শিথিলতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা যেন অতি দ্রুত তার উপস্থিতি নিশ্চিতের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও যেন তাদের অভ্যন্তরীণ গাফিলতি দূর করে, এটাই এখন সময়ের দাবি।

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *