মাস শেষ বেতন নেই, কর্মচারীদের ঈদ নেই : ‘ইয়া নাফসি’র যুগে ক্ষোভ ও চোখের জল
ক্যালেন্ডারের পাতায় মে মাস শেষ হতে চলল। আর মাত্র দিন কয়েক পরেই পবিত্র ঈদুল আজহা। যখন চারদিকে কোরবানির প্রস্তুতি, পরিবার-পরিজনদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর বাড়ি ফেরার তাগিদ—ঠিক তখনই এক বুক হাহাকার আর অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে এক দল কর্মজীবী মানুষের। মে মাস শেষ হয়ে গেলেও এখনো মেলেনি বকেয়া বেতন-ভাতা। ফলে উৎসবের আনন্দ তো দূরের কথা, সাধারণ জীবনযাত্রাই এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। কর্মচারীদের ভাষায়, “এ যেন এক ‘ইয়া নাফসি’র যুগ—যেখানে যার যার আখের গোছাতে সবাই ব্যস্ত, সাধারণের আকুতি শোনার কেউ নেই।”
সরেজমিনে এবং বিভিন্ন খাত সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বেসরকারি খাতের বহু প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কিছু তৈরি পোশাক কারখানা, বেসরকারি সংস্থা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের কর্মচারীরা এখনো মে মাসের বেতন কিংবা বোনাস পাননি। দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির অজুহাতে অনেক মালিকপক্ষ বেতন পরিশোধে গড়িমসি করছে।
পরিবারের আবদার মেটানোর ভাষা নেই
ঈদের এই সময়ে বাড়ি ফেরা, মা-বাবা, সন্তান কিংবা স্ত্রীর জন্য নতুন পোশাক কেনা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানির পশুবাজারের খোঁজ নেওয়া—যেকোনো উৎসবের চিরাচরিত নিয়ম। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় পরিবার-পরিজনদের মুখোমুখি হতে পারছেন না এসব কর্মজীবী মানুষ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “সন্তানরা জিজ্ঞেস করে কবে বাড়ি যাব, কী কিনব। ওদের তো আর বুঝানো যায় না যে মাস শেষ হলেও অফিস বেতন দেয়নি। বাড়িতে যাওয়ার টিকিটের টাকা নেই, কোরবানির চিন্তা তো এখন বিলাসিতা। আসলে মনের কষ্টটা কাউকে বলার মতো ভাষা আমাদের জানা নেই।”
‘কে শুনে কার কথা’—হতাশা চারদিকে
ভুক্তভোগী কর্মচারীদের অভিযোগ, বেতন-ভাতার দাবিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মিলছে না কোনো সদুত্তর। কেবল আজ-নয়-কাল বলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির এই কঠিন সময়ে বেতন না পেয়ে অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। “কে শুনে কার কথা”—এই প্রবাদটিই যেন এখন শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের এই চরম স্বার্থপরতা ও উদাসীনতাকে তারা তুলনা করছেন ‘ইয়া নাফসি’ বা আত্মকেন্দ্রিক যুগের সাথে।
বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতাদের উদ্বেগ
শ্রমিক অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎসবের ঠিক আগ মুহূর্তে বেতন-ভাতা আটকে রাখা কেবল অমানবিকই নয়, চরম অন্যায়। প্রতি বছরই ঈদের আগে এই চেনা সংকট তৈরি হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। প্রশাসন ও মালিকপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাবেই লাখো কর্মচারীর ঈদ আজ বিষাদে রূপ নিতে যাচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কর্মচারীদের এই ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রাখা হলে তা কেবল তাদের পরিবারকেই সংকটে ফেলবে না, বরং উৎসবের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ঈদের আনন্দ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং সামাজিক অসন্তোষ এড়াতে অবিলম্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা। যাতে আর কোনো কর্মচারীকে বলতে না হয়—”আমাদের ঈদ বলতে কিছু নেই।”


