নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

অনুমোদিত মেয়াদের চেয়ে কম সময় বহিঃবাংলাদেশ ছুটি ভোগ : অভোগকৃত দিনগুলো ছুটির হিসাবে সমন্বয় বা পুনঃজমার নিয়ম

সরকারি কর্মকর্তাদের অনেক সময় ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় কারণে অর্জিত ছুটিতে বহিঃবাংলাদেশ (বিদেশ) ভ্রমণের সরকারি আদেশ (জিও) নিতে হয়। তবে অনেক সময় জিও-তে অনুমোদিত সম্পূর্ণ মেয়াদ বিদেশে অবস্থান না করে, জরুরি প্রয়োজনে বা পূর্বপরিকল্পনা পরিবর্তন করে নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগদান করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অভোগকৃত বা অব্যবহৃত ছুটি কীভাবে মূল ছুটির হিসাবে সমন্বয় বা পুনঃজমা (Credit Back) করতে হয়, তা নিয়ে অনেক সরকারি কর্মচারীই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন।

সম্প্রতি এক সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তার ৩০ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটির জিও থাকা সত্ত্বেও তিনি বাস্তবে ১৫ দিন ছুটি ভোগ করেছেন এবং দেশে ফিরে যথানিয়মে কর্মস্থলে যোগদান করেছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধরণের অভোগকৃত বহিঃবাংলাদেশ ছুটি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধিমালা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘iBAS++’ (আইবাস প্লাস প্লাস)-এ এন্ট্রি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। নিচে এর বিস্তারিত আইনি ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়া তুলে ধরা হলো:

কোন বিধিমালার কোন ধারায় ছুটি সমন্বয় হয়?

সরকারি কর্মচারীদের অর্জিত ছুটি এবং বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ন্ত্রণ ও হিসাবায়নের বিষয়টি মূলত দুটি প্রধান বিধিমালার আলোকে পরিচালিত হয়:

১. বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস, পার্ট-১ (BSR Part-1): এই রুলসের বিধি অনুযায়ী ছুটির হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ২. নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯ (Prescribed Leave Rules, 1959): এই বিধিমালার মূল সারমর্ম হলো, একজন সরকারি কর্মচারী বাস্তবে ঠিক যতদিন ছুটি ভোগ করবেন, তার অর্জিত ছুটির হিসাব (Leave Account) থেকে কেবল ততদিনই বিয়োগ বা কর্তন করা যাবে।

যেহেতু বহিঃবাংলাদেশ ছুটি মূলত গড় বেতনে বা অর্ধ-গড় বেতনে অর্জিত ছুটি (Earned Leave) থেকে মঞ্জুর করা হয়, সেহেতু ৩০ দিনের জিও থাকলেও বাস্তবে ১৫ দিন ছুটি ভোগ করায় বাকি ১৫ দিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ছুটির হিসাবে অবিকল থেকে যাওয়ার কথা। তবে প্রশাসনিক রেকর্ড ও আইবাস++ এর ডাটাবেজ সঠিক রাখার জন্য এটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমন্বয় করতে হয়।

সমন্বয় ও পুনঃজমার (Credit Back) বাস্তব প্রক্রিয়া

যদি কোনো সরকারি কর্মচারী অনুমোদিত ছুটির চেয়ে কম দিন ভোগ করে কর্মস্থলে ফিরে আসেন, তবে তাকে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে হয়:

  • যোগদানপত্র দাখিল: দেশে ফেরার পর প্রথম কাজই হলো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের নিকট বিধি মোতাবেক যোগদানপত্র (Joining Letter) পেশ করা। এই যোগদানপত্রে উল্লেখ করতে হয় যে, অনুমোদিত ছুটির সম্পূর্ণ অংশ ভোগ না করে নির্দিষ্ট তারিখে কর্মস্থলে যোগদান করা হলো।

  • অনুমোদন ও আদেশ জারি: নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ উক্ত যোগদানপত্র গ্রহণ করে একটি দাপ্তরিক আদেশ বা প্রত্যয়নপত্র জারি করেন, যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ৩০ দিনের অনুমোদিত ছুটির বিপরীতে বাস্তবে ১৫ দিন ছুটি ভোগ করেছেন এবং বাকি ১৫ দিন অভোগকৃত রয়েছে।

  • ছুটির হিসাব হালনাগাদ: এই দাপ্তরিক আদেশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা প্রশাসনিক শাখা কর্মচারীর মূল ছুটির খতিয়ান বা লেজারে অভোগকৃত ১৫ দিন ছুটি আর কর্তন না করে আগের মতোই বহাল রাখে।

iBAS++ এ এন্ট্রি ও অনুমোদনের ডিজিটাল সমাধান

বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা এবং ছুটির হিসাব সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘iBAS++’ (Integrated Budget and Accounting System) এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই ডিজিটাল সিস্টেমে ছুটি সমন্বয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও স্বচ্ছ:

  • প্রকৃত ভোগকৃত দিনের এন্ট্রি: আইবাস++ এ ছুটির মডিউলে গিয়ে ৩০ দিনের পরিবর্তে বাস্তবে ভোগকৃত ১৫ দিন বহিঃবাংলাদেশ ছুটি হিসেবে এন্ট্রি দিতে হয়।

  • অনুমোদন (Approval): এরপর নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ডিডিও (DDO) কর্তৃক উক্ত এন্ট্রি আইবাস++ এ অ্যাপ্রুভ (Approve) করে নিতে হয়।

  • স্বয়ংক্রিয় ব্যালেন্স ঠিক থাকা: যেহেতু আইবাস++ সিস্টেমে শুধুমাত্র ভোগকৃত ১৫ দিনই এন্ট্রি ও অ্যাপ্রুভ করা হয়েছে, তাই কর্মচারীর মূল অর্জিত ছুটির ব্যালেন্স থেকে কেবল ১৫ দিনই মাইনাস হবে। বাকি ১৫ দিন সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আগের ব্যালেন্সের সাথে থেকে যাবে বা ক্রেডিট ব্যাক হয়ে থাকবে। এর জন্য আলাদাভাবে আইবাস++ এ কোনো প্লাস (+) বা পুনঃজমা করার দরকার পড়ে না, কারণ সিস্টেম কেবল যতটুকু অনুমোদিত এন্ট্রি হয়েছে, ততটুকুই কর্তন করে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: সরকারি চাকরিতে যেকোনো ছুটির ক্ষেত্রে কাগজের রেকর্ড এবং ডিজিটাল সিস্টেমের সামঞ্জস্য থাকা বাধ্যতামূলক। তাই ৩০ দিনের জিও থাকার পর ১৫ দিন ভোগ করলে, আইবাস++ এ সফলভাবে ১৫ দিনের এন্ট্রি সম্পন্ন করার পাশাপাশি মূল জিও, যোগদানপত্র এবং কর্তৃপক্ষের ছুটির মঞ্জুরি আদেশটি নিজের সার্ভিস বুক বা ব্যক্তিগত নথিতে (Personal File) যত্নসহকারে সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে পরবর্তীতে পেনশন বা ল্যাম্পগ্রান্ট উত্তোলনের সময় ছুটির হিসাব নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *