ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০২৬ : অল্প জমানোয় আজীবন নিশ্চিত আয়ের সুযোগ কি?
ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন স্কিম সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অনলাইন প্রক্রিয়ায় ঘরে বসেই এখন এই স্কিমের আওতায় অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবী ব্যতীত ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক এই স্কিমে যুক্ত হতে পারবেন।
অর্থ সচিবের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও এই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক সম্পদ (Asset) যা পেনশনারের মৃত্যুর পরও তার পরিবারকে সুরক্ষা দেবে।
বয়সের ভিত্তিতে জমার হিসাব ও সম্ভাব্য পেনশনের পরিমাণ
সরকারি পেনশন চার্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অল্প বয়সে যুক্ত হলে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অবদান রাখলে অবসরের পর প্রাপ্ত পেনশনের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যেমন:
২০ বছর বয়সে যুক্ত হলে (৪০ বছর মেয়াদে): কোনো ব্যক্তি ২০ বছর বয়সে এই স্কিমে যুক্ত হয়ে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা জমা দিলে, ৬০ বছর বয়স হওয়ার পর তিনি প্রতি মাসে ১,৪৬,০০১ টাকা করে আজীবন পেনশন পাবেন। আর যদি তিনি প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা জমা করেন, তবে মাসিক পেনশন পাবেন ৮৭,৬০১ টাকা।
৩০ বছর বয়সে যুক্ত হলে (৩০ বছর মেয়াদে): ৩০ বছর বয়সী একজন নাগরিক প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে জমা রাখলে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে ৬৩,৩৩০ টাকা পেনশন পাবেন। একই বয়সে মাসিক ৩,০০০ টাকা জমা রাখলে পেনশনের পরিমাণ হবে ৩৭,৩৯৮ টাকা।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রধান সুবিধা ও বৈচিত্র্যসমূহ
সর্বজনীন পেনশন স্কিমটিকে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে অত্যন্ত নমনীয় এবং আকর্ষণীয় ফিচার দিয়ে সাজানো হয়েছে:
আয়কর মুক্ত সুবিধা: সরকারি এই পেনশনের সম্পূর্ণ টাকা আয়কর মুক্ত থাকবে। অর্থাৎ, প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা পেনশনের ওপর কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না।
এককালীন অর্থ উত্তোলন: পেনশনার চাইলে তার পেনশনের মোট টাকার সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন তুলে নিতে পারবেন, যা পরবর্তীতে আর ফেরত দিতে হবে না।
বিনা সুদে বিশেষ ঋণ: বিশেষ বা জরুরি প্রয়োজনে জমাকৃত অর্থের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশবিহীন বা সুদহীন লোন বা অগ্রিম নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সহজ ও নমনীয় পরিবর্তন: সরকারি পেনশন আইডি সর্বদা একটিই থাকবে। গ্রাহক চাইলে যেকোনো সময় অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে তার স্কিম পরিবর্তন, মাসিক কিস্তির পরিমাণ কমানো/বাড়ানো এবং নমিনি পরিবর্তন করতে পারবেন।
হতদরিদ্রদের জন্য ‘সমতা স্কিম’: সমাজের একদম সুবিধাবঞ্চিত ও হতদরিদ্র মানুষের জন্য রয়েছে সমতা স্কিম। এই স্কিমে একজন গ্রাহক মাসে ৫০০ টাকা জমা দিলে, সরকার তার বিপরীতে আরও ৫০০ টাকা ভর্তুকি (ম্যাচিং গ্র্যান্ট) হিসেবে জমা দেবে। অর্থাৎ, গ্রাহকের হিসেবে প্রতি মাসে মোট ১,০০০ টাকা জমা হতে থাকবে।
মুদ্রাস্ফীতি ও টাকার মান কমে যাওয়ার শঙ্কা কতটুকু?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, আজ থেকে ৩০ বা ৪০ বছর পর টাকার মান তো কমে যাবে, তাহলে এই বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক?
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ: > মুদ্রাস্ফীতি একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে এই স্কিমের সৌন্দর্য হলো এর কিস্তির ধারাবাহিকতা। আপনি যেমন আজ ৫,০০০ টাকা জমা দিচ্ছেন, আজ থেকে ৪০ বছর পরেও কিন্তু মাসিক জমার পরিমাণ একই (৫,০০০ টাকাই) থাকছে। অর্থাৎ, আপনার জমার মূল্যমানও সময়ের সাথে সাথে সহজ হয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে, প্রাপ্ত পেনশন আপনার মোট জমাকৃত টাকার ২.৩ গুণ থেকে সর্বোচ্চ ২৪.৬ গুণ পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি মুদ্রাস্ফীতির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে দারুণ কার্যকর।
মৃত্যুর পর নমিনির অধিকার ও আজীবন সুরক্ষা
সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের মতোই ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর এই স্কিম থেকে পেনশন সুবিধা শুরু হবে। পেনশনারের বয়স ৮০ বছরের বেশি হলে পেনশনের টাকার পরিমাণ আরও বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
যদি কোনো পেনশনার পেনশন পাওয়া অবস্থায় বা পেনশন পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার মনোনীত নমিনি লভ্যাংশসহ জমার সব টাকা ফেরত পাবেন। পরবর্তীতে সেই টাকা অন্য কোনো লাভজনক খাতে পুনঃবিনিয়োগ করে পরিবার আজীবন স্বচ্ছন্দে চলতে পারবে।
আগ্রহী নাগরিকেরা বিস্তারিত তথ্য জানতে এবং রেজিস্ট্রেশন করতে সরকারি অফিশিয়াল ওয়েবসাইট www.upension.gov.bd ভিজিট করতে পারেন।



