২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ: আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, লক্ষ্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈষম্যহীন উন্নয়ন
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ স্লোগানকে সামনে রেখে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই ঐতিহাসিক বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করেন।
বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক ভিত পুনর্গঠন, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক নজরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামো
প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন সামষ্টিক সূচক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা বিগত বছরের তুলনায় বেশ পরিবর্তন এনে সাজানো হয়েছে:
- বাজেটের মোট আকার: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ। এটি বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের (৭ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
- মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা: আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৯base৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস হতে আসবে ৯১ হাজার কোটি টাকা।
- প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য: নতুন অর্থবছরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (GDP Growth) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের ওপর চেপে বসা উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন
প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা, সঞ্চয়পত্র এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বাজেটের ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার খাত
অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য দিতে সরকার ১০টি সুনির্দিষ্ট খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে:
১. সবার জন্য উন্নয়ন: বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা।
২. মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
৩. সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: জীবনচক্রভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি মজবুত করা।
৪. বিনিয়োগ-নির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, যুবসমাজের আয়বৃদ্ধি এবং কৃষিকে কৌশলগত খাদ্য নিরাপত্তা খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
৫. ব্যবসা সহজীকরণ (Deregulation): বিনিয়ন্ত্রণকরণের মাধ্যমে সরকারি কাজের বিলম্ব পরিহার করে স্বচ্ছ ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ তৈরি।
৬. আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে এনে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
৭. জ্বালানি নিরাপত্তা: উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড বজায় রাখতে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৮. আইসিটির বিকাশ: বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আইসিটি রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর।
৯. পরিবেশ ও পানিসম্পদ: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, সবুজ বিপ্লব এবং নদীসমূহের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালু করা।
১০. প্রশাসনিক সুশাসন: মেধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর বাস্তবায়ন।
খাতভিত্তিক ব্যয়ের রূপরেখা
সামাজিক অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো এবং সাধারণ সেবা—এই তিনটি মূল অংশে সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া মূলধারার অর্থনীতি থেকে আড়ালে থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি (Creative Economy), ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং সুনীল অর্থনীতিকে এবার জাতীয় অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার বিশেষ নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন যাত্রার চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যয়
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পাশাপাশি বিগত সরকারের দুর্নীতি ও পরিসংখ্যানের অসততার ফলে কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘ সময় ধরে ৮ শতাংশের নিচে আটকে ছিল।
তবে এই সমস্ত ধ্বংসস্তূপ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার (Value for Money) এবং সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টির (Job Creation) মাধ্যমে এই বাজেট দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।



