নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ নাকি ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন? সরকারি বিধি ও বাস্তবতার চুলচেরা বিশ্লেষণ
সরকারি দপ্তরে নারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্বোধন নিয়ে দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক বিতর্ক ও প্রশাসনিক রীতি পুনরায় আলোচনায় এসেছে। প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে—উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তা কি ‘স্যার’ হিসেবে সম্বোধিত হবেন, নাকি ‘ম্যাডাম’ ডাকা সমীচীন? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার প্রেক্ষিতে সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয় (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ঐতিহাসিক সার্কুলার এবং বর্তমান বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে এই বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক সরকারি আদেশ ও বিধিমালা (১.jpg নথির সূত্র)
আপনার সরবরাহকৃত ঐতিহাসিক সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের ১১ ডিসেম্বর (২৬ অগ্রহায়ণ ১৪০২ বাংলা) তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন কোষ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। স্মারক নং সংস্থাকো-১০২/৯০-৩১৯ এর অধীন জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে সরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানে মৌখিক এবং লিখিত সম্বোধনের বিষয়ে স্পষ্ট ও বিধিবদ্ধ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্মারক প্রজ্ঞাপন (১১-১২-১৯৯৫ ইং) এর মূল বিধি ও সুপারিশসমূহ:
(ক) পত্র যোগাযোগের ক্ষেত্রে: সরকারি অফিস/কর্মকর্তাগণের নামে প্রেরিত পত্রাদিতে পুরুষ বুঝাইলে ‘জনাব/মহোদয়’ ও মহিলা বুঝাইলে ‘মহোদয়া/জনাবাসমূহ’ ব্যবহার করা যাইতে পারে।
(খ) মৌখিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে: মৌখিক সম্বোধনে পুরুষের ক্ষেত্রে ‘স্যার’ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘ম্যাডাম’ ব্যবহার করা যাইতে পারে।
(গ) নামের পূর্বে সম্মানসূচক শব্দ: পুরুষ ও মহিলাদের নামের পূর্বে যথাক্রমে ‘জনাব’ ও ‘বেগম’ শব্দ দুটিই সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে ব্যবহারের পদ্ধতিটি চলিতে পারে।
এই ঐতিহাসিক সরকারি দলিল (১.jpg) থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, দাপ্তরিক বা মৌখিক কোনো ক্ষেত্রেই নারী কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক ‘স্যার’ ডাকার কোনো আইনি বা বিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের আদি নিয়মাবলীতে কখনোই ছিল না। বরং নারীদের ক্ষেত্রে ‘ম্যাডাম’ বা ‘মহোদয়া’ ব্যবহারের স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও পরামর্শ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ আমলের অলিখিত চর্চা ও খামখেয়ালি বিধি
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলাতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক ক্ষেত্রে অলিখিতভাবে নারী ডিসি (জেলা প্রশাসক), ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) বা পুলিশ সুপারদেরও অধস্তন ও সাধারণ জনগণের মাধ্যমে ‘স্যার’ ডাকার একটি প্রথা চালু করা হয়েছিল।
মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা বা সাধারণ সেবাগ্রহীতা জনসাধারণ নারী কর্মকর্তাদের ‘ম্যাডাম’ ডাকলে অনেক কর্মকর্তা অসন্তুষ্ট হতেন এবং ‘সম্বোধন করা হয় চেয়ারকে, ব্যক্তিকে নয়’—এই চাটুকারিতাপূর্ণ যুক্তিতে নিজেদের ‘স্যার’ সম্বোধন করতে বাধ্য করতেন। দেশের সাধারণ মানুষ একে তৎকালীন পলাতক সরকারের আমলাতান্ত্রিক দাপট ও ব্যক্তিগত খামখেয়ালিপনার অংশ হিসেবেই দেখতেন, যার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ছিল না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথার বিলুপ্তি ও ডক্টর ইউনূসের সার্কুলার/বার্তা
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় যে—সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের প্রভু নন, বরং সেবক।
ডক্টর ইউনূসের সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক ও প্রশাসনিক নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয় যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ ডাকার জন্য সাধারণ জনগণকে কোনোভাবেই বাধ্য বা চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। ঔপনিবেশিক আমলের দাসত্বমূলক মানসিকতা এবং বিগত সরকারের চাটুকারিতার প্রথা ভেঙে জনগণকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদের চাপিয়ে দেওয়া খামখেয়ালি সম্বোধন সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। তবে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে প্রশাসনের কিছু স্তরে এখনও আগের সেই ‘স্যার’ বলার প্রচলন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি।
ব্যক্তি বনাম চেয়ার: নাম ধরে বা পদবি ধরে ডাকাই উত্তম বিকল্প
প্রশাসনিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, যদি কোনো ঊর্ধ্বতন নারী কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ ডাকতে কারও ব্যক্তিগত বা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা থাকে, তবে জোর করে স্যার ডাকানোর কোনো নিয়ম নেই। সরকারি বিধি অনুযায়ী ‘ম্যাডাম’ অত্যন্ত সম্মানজনক একটি বৈশ্বিক শব্দ।
আর যদি কেউ ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ কোনোটি বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তবে সবচেয়ে আধুনিক ও পেশাদার সমাধান হলো পদের নাম ধরে (যেমন: ‘ইউএনও মহোদয়’, ‘ডিসি মহোদয়’ বা ‘পরিচালক মহোদয়’) সম্বোধন করা। এটি একদিকে যেমন ঔপনিবেশিক দাসত্বমূলক মানসিকতা থেকে মুক্তি দেয়, অন্যদিকে দাপ্তরিক পেশাদারিত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখে। পরিবর্তিত নতুন বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের মূল ফোকাস হওয়া উচিত জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রটোকল বা সম্বোধনের পেছনে ক্ষমতার দাপট দেখানো নয়।



