সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন ২০২৬ : আকাশচুম্বী পারিশ্রমি জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে

দেশের ব্যাংক খাত যখন একদিকে ঋণ অনিয়ম, তারল্য সংকট ও আস্থার সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, ঠিক তখনই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন-ভাতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এমডিদের পারিশ্রমিকের একটি পরিসংখ্যান জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

বেতন কাঠামোর বিশদ পরিসংখ্যান (২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভিত্তিতে)

​প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর এমডিদের মাসিক বেতন ১৭ লাখ থেকে ৩৯ লাখ টাকার ঘরে অবস্থান করছে। তালিকার শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর এমডিদের মাসিক বেতনের একটি চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

ব্যাংকের নাম

মাসিক গড় বেতন (প্রায়)

সিটি ব্যাংক

৩৮.৫৮ লাখ টাকা

ইস্টার্ন ব্যাংক

২৯.৮৩ লাখ টাকা

ডাচ-বাংলা ব্যাংক

২৭.০০ লাখ টাকা

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক

২৩.৮৩ লাখ টাকা

ব্র্যাক ব্যাংক

২১.৩৩ লাখ টাকা

যমুনা ব্যাংক

২০.৮৩ লাখ টাকা

ব্যাংক এশিয়া

২০.২৫ লাখ টাকা

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক

১৭.৮৩ লাখ টাকা

প্রাইম ব্যাংক

১৭.১৭ লাখ টাকা

সূত্র: সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বাজার বিশ্লেষণ।

​উল্লেখ্য যে, এর মধ্যে অনেক ব্যাংকের এমডিদের বার্ষিক আয় ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিপরীতে, সরকারি ব্যাংকগুলোতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন পান, যা বেসরকারি খাতের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

কেন এই বিশাল বেতন?

​ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এমডিদের বেতন মূলত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক নির্ধারিত হয়। বাজারের প্রতিযোগিতায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে ধরে রাখতে অনেক ব্যাংক আকর্ষণীয় পারিশ্রমিক প্যাকেজ অফার করে। ব্যাংকগুলোর দাবি, টেলিকম বা বহুজাতিক কোম্পানির সিইওদের সাথে তুলনা করলে ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ পদে দায়বদ্ধতা ও ঝুঁকির তুলনায় এই বেতন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈষম্য

​এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর সরকারি চাকরিতে মেধাবী জনবল ধরে রাখা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, বেসরকারি খাতের এই বিপুল ব্যবধান সরকারি প্রশাসনের তরুণ মেধাবীদের সিভিল সার্ভিস বা সরকারি উচ্চপদে যোগদানে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

​সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা বিভিন্ন মন্তব্যে দাবি করা হয়েছে:

  • ​রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর সাথে যদি বাজারভিত্তিক বেতনের বড় ধরনের ব্যবধান থাকে, তবে তা দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
  • ​অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব এলে মূল্যস্ফীতির যুক্তি দেখানো হয়, কিন্তু বেসরকারি খাতের এই আকাশচুম্বী বেতন নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা বিধিনিষেধ নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা

​বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের বেতন নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ সীমিত। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও মুনাফার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পারিশ্রমিক নির্ধারণের জন্য একটি যৌক্তিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

উপসংহার

ব্যাংক এমডিদের বেতন বিতর্ক মূলত দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ নীতি এবং রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। একদিকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক কৌশল, অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক সাম্য—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *