আইএমএফের আপত্তিতে আবারো অনিশ্চয়তায় নবম পে-স্কেল, নতুন পে-কমিশন গঠনের পরামর্শ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আবারো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রভাব খতিয়ে দেখতে এবার সরাসরি বাগড়া দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত হিসেবেই এই পে-স্কেলের অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করতে চায় সংস্থাটি।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রয়োজনে নতুন করে পে-কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা।
অতিরিক্ত লাগবে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের তীব্র দাবির মুখে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই নবম পে-কমিশন গঠন করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার (ইউনুস প্রশাসন)। তবে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। তৎকালীন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় এই বিশাল ব্যয়ের বোঝা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে এসে চেপেছে। এই উচ্চাভিলাষী প্রস্তাব নিয়ে বর্তমান সরকারও বেশ অস্বস্তিতে রয়েছে।
কাটছাঁট ও এক ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তা
চলতি অর্থবছরের বাজেটে পে-স্কেলের জন্য বাড়তি কিছু অর্থ রাখা হলেও এটি বাস্তবায়নে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রথমে তিন ধাপে এবং পরবর্তীতে দুই ধাপে এটি বাস্তবায়নের কথা ভাবা হলেও, কর্মচারীদের তীব্র আপত্তির কারণে সরকার কিছুটা কাটছাঁট করে আগামী অর্থবছর থেকে এক ধাপে পুরোপুরি কার্যকর করার চিন্তা করছিল। কিন্তু সরকারের এই নতুন উদ্যোগেই এখন পর্যালোচনার নজর দিয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের মূল প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আজ ১২ জুলাই থেকে সরকারের বিভিন্ন দফতর, বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের সাথে পাঁচ দিনব্যাপী ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে আইএমএফের প্রতিনিধি দল। এই বৈঠকে পে-স্কেল নিয়ে মূলত দুটি বিষয়ে জানতে চেয়েছে সংস্থাটি: ১. পে-স্কেল বাস্তবায়নের এই বিশাল অর্থের উৎস কী এবং এর ফলে দেশের রাজস্ব আদায় বাড়বে কিনা? ২. এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে এলে দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির (Inflation) ওপর তার প্রভাব কেমন হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ধার-দেনা এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর ভর করে চলা বর্তমান অর্থনীতিতে দাতা সংস্থাগুলো সহজে এই বিশাল ব্যয় মেনে নেবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তিগতভাবে সরকারি কর্মচারীরা লাভবান হলেও রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে, তবে সেই লাভের কোনো মূল্য থাকবে না। তাই সরকারের উচিত সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে একটি বাস্তবসম্মত পে-কমিশন গঠন করা।
নতুন ঋণের ভবিষ্যৎ ও অন্যান্য সাংঘর্ষিক নীতি
বিগত ঋণ কর্মসূচি বাতিলের পর বর্তমান সরকার আইএমএফের কাছ থেকে নতুন করে সাড়ে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি করতে চায়। তবে এই ঋণ দেওয়ার আগে আইএমএফ বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো, বাজেট, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থায়ন এবং সামগ্রিক আর্থিক খাত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পে-স্কেল ছাড়াও সরকারের কিছু নীতি আইএমএফের শর্তের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে। যেমন— এনবিআরের বাইফারকেশন পলিসি (বিভাজন নীতি) অ্যাডপ্ট না করা, ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিনেন্সে নতুন ধারা যোগ করা এবং এক্সচেঞ্জ রেট বা ডলারের দর ফিক্সড করে দেওয়া। আইএমএফ এই বিষয়গুলোকে বেশ নেতিবাচকভাবে দেখছে।
১২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের এই বৈঠক শেষে প্রতিনিধি দল যে প্রতিবেদন জমা দেবে, তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের এই নতুন ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের ভবিষ্যৎ। সব শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগামী ডিসেম্বর মাসে এই ঋণ পাস হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।


