খণ্ডিত পে-স্কেল ও বিশেষ সুবিধা বাতিলের মারপ্যাঁচ: সন্তুষ্ট নন নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা
দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষা আর সুদীর্ঘ আন্দোলনের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা এসেছে। তবে এই আনন্দের আবহ কাটতে না কাটতেই মাঠপর্যায়ের নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম ধাপে ৫০% বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, বিদ্যমান ‘বিশেষ সুবিধা’ বা বিশেষ ইনক্রিমেন্ট বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে বাস্তব বৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশে। কর্মচারীদের দাবি—মূল্যস্ফীতির এই চরম সংকটের সময়ে আংশিক বা কিস্তিতে নয়, বরং শতভাগ মূল বেতন (বেসিক) একযোগে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩৫% বৃদ্ধির হিসাব ও ২০তম গ্রেডের বাস্তব চিত্র
অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুসারে, নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপে ৫০% বেসিক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এর সাথে একটি বড় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে—নতুন কাঠামো চালু হওয়া মাত্রই কর্মচারীদের বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা বা বিশেষ ইনক্রিমেন্ট বাতিল হয়ে যাবে।
বর্তমানে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ১৫% বিশেষ সুবিধা পাচ্ছিলেন। নতুন ৫০% থেকে এই ১৫% বিশেষ সুবিধা বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে মাত্র ৩৫%। এই জটিল গাণিতিক মারপ্যাঁচে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা।
একটি বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ক্ষেত্রে এই ৩৫% বৃদ্ধির ফলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি ঘটবে মাত্র প্রায় ৪,১১২.৫০ টাকা। কর্মচারীদের প্রশ্ন—বর্তমান বাজারের লাগামহীন পরিস্থিতিতে এই সামান্য টাকা দিয়ে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন তো দূরের কথা, সাধারণ ভরণপোষণ করাই অসম্ভব।
বাজার পরিস্থিতি ও আংশিক প্রাপ্তির অসারতা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি সেবামূলক খাতের ব্যয় আকাশচুম্বী। এই পরিস্থিতিতে ১১ বছর পর এসে যদি একজন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী মাত্র চার হাজার টাকার মতো বাড়তি পান, তবে তা বাজারে গিয়ে খুব দ্রুতই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
আন্দোলনরত কর্মচারী প্রতিনিধিদের মতে—যে পে-স্কেলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, সেটি যদি খণ্ডিতভাবে কিংবা কিস্তিতে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না। এই আংশিক বা খণ্ডিত প্রাপ্তি দেশের লাখ লাখ নিম্ন আয়ের কর্মচারীকে কোনো প্রকৃত আর্থিক স্বস্তি দিতে সক্ষম হবে না।
“অনুগ্রহ নয়, ন্যায্য অধিকার চাই”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন বিভাগীয় ফোরামে কর্মচারীরা এখন সোচ্চার। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তারা সরকারের কোনো ‘অনুগ্রহ’ বা খয়রাতি সাহায্য চান না, বরং তাদের অধিকার চান। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সচল রাখতে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি, অথচ পে-স্কেলের এই খণ্ডিত সুবিধা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
কর্মচারী ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO Bangladesh) বরাবর জোর দাবি তোলা হচ্ছে:
খণ্ডিত নয়, পূর্ণ মূলবেতন বাস্তবায়ন চাই: কোনো ধাপে ধাপে বা আংশিক পদ্ধতি মেনে নেওয়া হবে না।
কিস্তিতে নয়, শতভাগ বেসিক চাই: প্রথম ধাপেই নতুন পে-স্কেলের শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করতে হবে।
বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা: নতুন স্কেলের পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করতে পূর্বের বিশেষ সুবিধাগুলোর সাথে এটিকে সাংঘর্ষিক করা যাবে না।
প্রশাসনের তৃণমূল স্তরের কর্মচারীদের একাংশ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘ ১১ বছর আন্দোলনের পর যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও খণ্ডিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়, তবে সাধারণ কর্মচারীরা তা মুখ বুজে মেনে নেবে না। এখন দেখার বিষয়, আগামী ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে সরকার এই সাধারণ কর্মচারীদের দাবি ও বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনে কি না।



