নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় সন্তান ৬ মাসের কম হলে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিশেষ বিধান

প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় কোনো নারী কর্মচারীর সঙ্গে যদি ছয় মাসের কম বয়সী সন্তান থাকে, তাহলে সন্তান ছয় মাস বয়সে না পৌঁছানো পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার বিশেষ বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে পূর্ণ ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নয়; বরং সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হতে যতদিন বাকি থাকে, বিধান অনুযায়ী ততদিন পর্যন্ত ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (Part-1)-এর Rule 197-এর Sub-rule (1) সংশোধন করে ২০২১ সালে এই বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগের প্রবিধি-১ শাখা থেকে জারি করা এস.আর.ও. নং ৯৩-আইন/২০২১-এর মাধ্যমে এ সংশোধন আনা হয়। সরকারি গেজেটটি ২১ এপ্রিল ২০২১ তারিখে প্রকাশিত হয় এবং প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সংশোধনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

কী বলা হয়েছে সংশোধিত বিধিতে

সংশোধিত Rule 197(1)-এর মূল বিধান অনুযায়ী, কোনো নারী সরকারি কর্মচারী মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করবে। ছুটির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে ছুটি শুরুর তারিখ অথবা সন্তান প্রসবের তারিখ—যেটি আগে ঘটে, সেটিকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।

তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বা বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, কোনো নারী প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় ছয় মাসের কম বয়সী সন্তানসহ যোগদান করলে এবং তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আবেদন করলে, তাকে এমন মেয়াদের ছুটি দেওয়া যাবে, যা সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে

অর্থাৎ, একজন নারী চাকরিতে যোগদানের আগেই সন্তান জন্ম দিয়েছেন—শুধু এ কারণে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ থেকে বাদ পড়বেন না। তবে তার সন্তানের বয়স যদি ইতোমধ্যে কয়েক মাস হয়ে থাকে, তাহলে ছুটির মেয়াদও সেই অনুযায়ী কমে যাবে।

উদাহরণে বিষয়টি আরও পরিষ্কার

ধরা যাক, কোনো নারী প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় তার সন্তানের বয়স মাস। তিনি চাকরিতে যোগদানের পর বিধি অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করলে, সন্তান ছয় মাস বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত অর্থাৎ বাকি ৪ মাস পর্যন্ত ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।

আবার সন্তানের বয়স যদি চাকরিতে যোগদানের সময় ৫ মাস হয়, তাহলে সন্তান ছয় মাস পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ মাস পর্যন্ত এই বিশেষ মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ প্রযোজ্য হতে পারে।

অন্যদিকে, সন্তানের বয়স যদি ইতোমধ্যে ৬ মাস পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে এই বিশেষ বিধানের শর্ত—‘ছয় মাসের কম বয়সী সন্তান’—আর পূরণ হবে না।

এটি কি প্রথম সন্তান হওয়ার শর্ত?

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংশোধিত বিধিতে ‘first appointment’ বা ‘প্রথম নিয়োগ/প্রথমবার সরকারি চাকরিতে প্রবেশ’ বলা হয়েছে; ‘প্রথম সন্তান’ বলা হয়নি। ফলে বিধানটির কেন্দ্রবিন্দু হলো ওই নারী কর্মচারীর সরকারি চাকরিতে প্রথম নিয়োগের সময় সন্তানের বয়স ছয় মাসের কম কি না—সন্তানটি প্রথম সন্তান কি না, সেটি এই বিশেষ শর্তের ভাষায় নির্ধারক নয়।

কেন এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার সময় একজন নারী কর্মচারী যদি সদ্য মা হয়ে থাকেন, তাহলে প্রচলিত ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান প্রয়োগে একটি বাস্তব জটিলতা তৈরি হতে পারত। কারণ সাধারণ নিয়মে মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রসবের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের সময় সন্তান ইতোমধ্যে জন্মগ্রহণ করে থাকলে পরিস্থিতিটি আলাদা।

২০২১ সালের সংশোধনের মাধ্যমে এই বাস্তব পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে চাকরিতে যোগদানের সময় শিশুর বয়স ছয় মাসের কম থাকলে মা ও শিশুর পরিচর্যার জন্য একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষা তৈরি হয়েছে।

তবে এটি ‘নতুন করে ছয় মাস’ ছুটি নয়

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ রয়েছে।

অনেকে মনে করতে পারেন, ছয় মাসের কম বয়সী সন্তান নিয়ে প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে নতুন করে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়া যাবে। বিধির ভাষা তা বলে না।

বিশেষ বিধানে ছুটির মেয়াদকে সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার তারিখ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তাই সন্তানের বয়স যত বেশি হবে, এই বিশেষ বিধানের আওতায় ছুটির অবশিষ্ট সময় তত কম হবে।

অর্থাৎ—

  • সন্তান ১ মাস বয়সী → ছয় মাস পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ প্রায় ৫ মাস;
  • সন্তান ২ মাস বয়সী → সর্বোচ্চ প্রায় ৪ মাস;
  • সন্তান ৩ মাস বয়সী → সর্বোচ্চ প্রায় ৩ মাস;
  • সন্তান ৪ মাস বয়সী → সর্বোচ্চ প্রায় ২ মাস;
  • সন্তান ৫ মাস বয়সী → সর্বোচ্চ প্রায় ১ মাস।

এগুলো বিধানের মূল নীতিটি বোঝানোর উদাহরণ; বাস্তবে ছুটির সুনির্দিষ্ট তারিখ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ ও প্রযোজ্য ছুটি গণনার নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

কোন বিধির অধীনে ছুটি মঞ্জুর হবে?

এই সুবিধার ভিত্তি হলো Bangladesh Service Rules (Part-1)-এর Rule 197। ২০২১ সালের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই বিধির Sub-rule (1) প্রতিস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুরের জন্য Rule 149 বা Rule 150-এ উল্লেখিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়টিও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

সরকারি গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, এই সংশোধন রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা হয় এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে সন্তান জন্ম নিলেও সুযোগ

এই বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নারী কর্মচারীর সন্তান সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগেই জন্মগ্রহণ করেছে—এ কারণে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই বিশেষ সুবিধা থেকে বাদ পড়ছেন না।

বরং প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় যদি সন্তানের বয়স ছয় মাসের কম থাকে এবং তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করেন, তাহলে সন্তান ছয় মাস বয়সে পৌঁছানো পর্যন্ত ছুটি দেওয়ার সুযোগ বিধিতে স্পষ্টভাবে রাখা হয়েছে।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। নিয়োগ পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়া, নিয়োগপত্র পাওয়া, যোগদান এবং সন্তান জন্মদানের সময়ের মধ্যে যদি সময়ের পার্থক্য থাকে, তবুও বিধির শর্ত পূরণ হলে এই বিশেষ ছুটির সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।

আবেদন করলেই কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছুটি শুরু হবে?

বিধির ভাষা অনুযায়ী, নারী সরকারি কর্মচারীকে মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আবেদন করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রযোজ্য বিধি অনুসারে ছুটি মঞ্জুর করবে। তাই শুধু সন্তান ছয় মাসের কম বয়সী হলেই কোনো আবেদন ছাড়াই ছুটি কার্যকর হয়ে যাবে—এমনটি বলা ঠিক নয়।

প্রয়োজনে কর্মচারীর দপ্তর সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র, সন্তানের জন্মতারিখ এবং চাকরিতে প্রথম নিয়োগের তথ্য যাচাই করে ছুটির মেয়াদ নির্ধারণ করতে পারে।

সাধারণ মাতৃত্বকালীন ছুটি বনাম নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত মায়ের বিশেষ সুবিধা

দুইটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।

সাধারণ বিধান: নারী সরকারি কর্মচারীর মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ ছয় মাস।

বিশেষ বিধান: কোনো নারী প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় ছয় মাসের কম বয়সী সন্তানসহ যোগদান করলে, আবেদন সাপেক্ষে সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

অতএব, দ্বিতীয়টি মূল ছয় মাসের বিধানের একটি বিশেষ পরিস্থিতির জন্য করা সংযোজন। এটি এমন নয় যে চাকরিতে যোগদানের পর প্রত্যেক নারী কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার ছয় মাসের নতুন ছুটি পাবেন।

বেসরকারি চাকরির মাতৃত্বকালীন সুবিধার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির এই বিধানটি Bangladesh Service Rules (Part-1)-এর অধীন। এটি বাংলাদেশ শ্রম আইনের অধীন বেসরকারি খাতের মাতৃত্বকালীন সুবিধার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুসারেই ছুটি নির্ধারিত হবে।

নারী সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

২০২১ সালের এই সংশোধন কার্যত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করেছে—প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় সন্তানের বয়স ছয় মাসের কম থাকলেও মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ রয়েছে।

তবে ছুটির মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল সীমা হলো সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার তারিখ। তাই সন্তানের বয়স যত কম, অবশিষ্ট ছুটির সময় তত বেশি; আর বয়স ছয় মাসের কাছাকাছি হলে ছুটির সময়ও তত কম হবে।

সরকারি গেজেটে প্রকাশিত সংশোধিত বিধিটি এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত Rule 197(1)-এর শর্তটি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে এবং সংশোধনটি অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

সারকথা: প্রথমবার সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় কোনো নারী কর্মচারীর সন্তানের বয়স যদি ৬ মাসের কম থাকে, তাহলে তিনি আবেদন করলে সন্তানের বয়স ৬ মাস পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এটি নতুন করে পূর্ণ ছয় মাসের ছুটি নয়; সন্তানের ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ের ভিত্তিতেই বিশেষ ছুটির মেয়াদ নির্ধারিত হবে।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *