নতুন পে-স্কেলের হিসাব মেলাতে হিমশিম সরকার, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন সরকারি চাকরিজীবীরা
নতুন জাতীয় পে-স্কেলের মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির হিসাব মেলাতে গিয়ে বড় ধরনের হিমশিম খাচ্ছে সরকার। দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর রূপরেখা সরাসরি একযোগে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত এই পে-স্কেলটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং গ্যাজেট প্রকাশে বিলম্বের কারণে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বৈঠক ও রূপরেখায় পরিবর্তন: মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি পে-স্কেলের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করার জন্য বারবার বৈঠকে বসলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। সম্প্রতি সচিবালয়ে এ সংক্রান্ত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুপারিশমালা চূড়ান্ত রূপ দিতে চলতি মাসে আরও দুই থেকে তিনটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চাপ সামলাতে সরকার বাধ্য হয়ে প্রস্তাবিত গ্রেডগুলোর মূল বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধায় কিছুটা কাটছাঁট ও পরিবর্তন আনছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ ও কারিগরি জটিলতা: অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সচিব কমিটি নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে কেবল মূল বেতন (Basic Salary) বাড়ানো হবে এবং পরবর্তী ধাপগুলোতে অন্যান্য ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা কার্যকর করা হবে।
অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার সংবাদমাধ্যমকে জানান, সচিব কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত সুপারিশমালা জমা দেয়নি এবং তাদের আরও কিছুটা সময় লাগবে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় পে-স্কেল এক বা দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে, এখানে সর্বোচ্চ তিন ধাপের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত ও কারিগরি জটিলতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জানান, বর্তমানে দেশের সকল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ‘আইবাস প্লাস’ (iBAS++) সফটওয়্যার এবং ‘ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার’ (EFT)-এর মাধ্যমে মাসিক বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি প্রদান করা হয়। এখন যদি মূল বেতনকে ভেঙে কয়েক দফায় (যেমন প্রথমে ৫০ বা ৬০ শতাংশ) কার্যকর করতে হয়, তবে পুরো আইটি সিস্টেম ও সফটওয়্যার কাঠামোতে বারবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। দেশের সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে একযোগে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের উৎকণ্ঠা: নতুন অর্থবছর শুরু হয়ে গেলেও এখনো পে-স্কেলের চূড়ান্ত গ্যাজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও প্রজ্ঞাপন না আসায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন পেনশনভোগী বা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা। কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়ছে, কিংবা কবে নাগাদ গ্যাজেট প্রকাশ হবে—তা স্পষ্ট না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সংশয় ক্রমেই বাড়ছে।
বকেয়াসহ বেতন পাওয়ার আশ্বাস ও আশার আলো: সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা পর্যালোচনা করেই নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে গ্যাজেট প্রকাশের সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ তিনি উল্লেখ করেননি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পে-স্কেলের খসড়া এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার কারণে গ্যাজেট প্রকাশে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, গ্যাজেট প্রকাশে যত দিনই দেরি হোক না কেন, এর কার্যকারিতা চলতি বছরের ১লা জুলাই থেকেই গণনা করা হবে। অর্থাৎ, প্রজ্ঞাপন জারির পর সরকারি চাকরিজীবীরা তাঁদের বর্ধিত বেতন বকেয়া (Arrears) হিসেবে একসঙ্গে পেয়ে যাবেন।


