সরকারি কর্মচারীদের দৈনিক ও ভ্রমণ ভাতা: ২০২২ সালের প্রজ্ঞাপনই এখনো কার্যকর
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৈনিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা এবং বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে ২০২২ সালের অর্থ বিভাগের পুনর্নির্ধারিত হারই বর্তমানে প্রযোজ্য রয়েছে। নতুন কোনো পৃথক হার নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন পাওয়া না যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের ভাতা হিসাব করতে এই হার অনুসরণ করা হচ্ছে। অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটেও ১৭ জুলাই ২০২২ তারিখে প্রকাশিত পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটিকেই মূল হার নির্ধারণকারী আদেশ হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগ থেকে দৈনিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা ও বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতা বিল দাখিলসংক্রান্ত বিভিন্ন নোটিশ প্রকাশ করেছে। এগুলো নতুন হার নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন নয়। অর্থ বিভাগের নোটিশ তালিকায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিল দাখিলের নির্দেশনা দেখা গেলেও নতুন ভাতা হার পুনর্নির্ধারণের কোনো পৃথক আদেশ পাওয়া যাচ্ছে না।
২০২২ সালের প্রজ্ঞাপনে যে হার নির্ধারণ করা হয়
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারীদের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
- ক্যাটাগরি-১: ৫ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব গ্রেডভুক্ত কর্মচারী
- ক্যাটাগরি-২: ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম গ্রেডভুক্ত কর্মচারী
- ক্যাটাগরি-৩: ১১তম থেকে ১৬তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারী
- ক্যাটাগরি-৪: ১৭তম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্ত কর্মচারী
দৈনিক ভাতার হার
প্রজ্ঞাপনে বিভিন্ন গ্রেড অনুযায়ী দৈনিক ভাতার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-১-এর ক্ষেত্রে ১ম-৬ষ্ঠ গ্রেডে ১,৪০০ টাকা, ২য়-৩য় গ্রেডে ১,২২৫ টাকা এবং ৪র্থ-৫ম গ্রেডে ১,০৫০ টাকা পর্যন্ত হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-২-এর ৬ষ্ঠ-৭ম গ্রেডে ৯০০ টাকা এবং ৮ম-১০ম গ্রেডে ৮৭৫ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।
অন্যদিকে ক্যাটাগরি-৩-এর ১১তম-১৩তম গ্রেডে দৈনিক ভাতা ৭০০ টাকা এবং ১৪তম-১৬তম গ্রেডে ৪৯০ টাকা। ক্যাটাগরি-৪ অর্থাৎ ১৭তম-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ টাকা।
প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় শহর ও এলাকার জন্য সাধারণ হারের ওপর অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ হারে দৈনিক ভাতা প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ভ্রমণ ভাতাতেও রয়েছে গ্রেডভিত্তিক হার
ভ্রমণের ক্ষেত্রে দূরত্ব ও যাতায়াতের মাধ্যম অনুযায়ী আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্যাটাগরি-১-এর কর্মচারীদের বিমানযোগে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ৩০ টাকা এবং বিমান ছাড়া ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১৮ টাকা হারে ভ্রমণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্যাটাগরি-২-এর ক্ষেত্রে ২০০ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটারে ১২ টাকা এবং ২০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বের জন্য ১৫ টাকা হারে ভ্রমণ ভাতা নির্ধারিত রয়েছে।
ক্যাটাগরি-৩ ও ৪-এর ক্ষেত্রে ২০০ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ৬ টাকা এবং ২০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বে ৮ টাকা হারে ভ্রমণ ভাতা প্রযোজ্য।
অর্থাৎ ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে শুধু কর্মচারীর গ্রেড নয়, ভ্রমণের দূরত্ব এবং যাতায়াতের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।
বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতার নিয়ম
চাকরির প্রয়োজনে এক কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে বদলি হলে সরকারি কর্মচারীরা নির্ধারিত নিয়মে বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতা পেয়ে থাকেন। প্রজ্ঞাপনে কর্মচারীর নিজের জন্য একটি ভ্রমণ ভাতা এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংখ্যক ভ্রমণ ভাতার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া বদলির সময় ব্যক্তিগত মালামাল বা Personal Effect পরিবহনের জন্যও নির্ধারিত হারে পরিবহন ব্যয় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের হিসাবে এই ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অর্থের সঙ্গে দূরত্বভিত্তিক পরিবহন খরচ যোগ করার পদ্ধতিও উল্লেখ করা হয়েছে।
বদলির সময় ব্যক্তিগত মালামাল পরিবহনে নির্ধারিত হার
বদলিজনিত মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে ক্যাটাগরি অনুযায়ী নির্ধারিত অর্থ ও দূরত্বভিত্তিক হার রয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী—
- ক্যাটাগরি-১: একাকী ভ্রমণে ১,৫০০ টাকা এবং পরিবারসহ ভ্রমণে ৩,০০০ টাকা; দূরত্বভিত্তিক পরিবহন ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে ৫০ টাকা।
- ক্যাটাগরি-২: একাকী ভ্রমণে ১,২০০ টাকা এবং পরিবারসহ ভ্রমণে ২,৫০০ টাকা; প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ টাকা।
- ক্যাটাগরি-৩: একাকী ভ্রমণে ৮০০ টাকা এবং পরিবারসহ ভ্রমণে ২,০০০ টাকা; প্রতি কিলোমিটারে ২০ টাকা।
- ক্যাটাগরি-৪: একাকী ভ্রমণে ৫০০ টাকা এবং পরিবারসহ ভ্রমণে ৬০০ টাকা; প্রতি কিলোমিটারে ৮ টাকা।
ফলে বদলির সময় প্রাপ্য অর্থ শুধু একটি নির্দিষ্ট ভাতায় সীমাবদ্ধ নয়; কর্মচারীর শ্রেণি, পরিবারসহ না একাকী ভ্রমণ এবং কর্মস্থলের দূরত্বের ওপর মোট প্রাপ্য অর্থ নির্ভর করে।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত
প্রজ্ঞাপনে ভ্রমণ ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, কর্মস্থলে নিয়মিত যাতায়াতকে সরকারি ভ্রমণ হিসেবে গণ্য করে ভ্রমণ ভাতা দাবি করা যাবে না।
এ ছাড়া একাকি বা দলগতভাবে বদলির ক্ষেত্রে ভ্রমণ ভাতা ও পরিবহন ব্যয় পাওয়ার বিষয়েও আলাদা নির্দেশনা রয়েছে। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করলে সাধারণভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জন্য প্রাপ্য ভ্রমণ ভাতার ওপর প্রভাব পড়ে; তবে মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিবহন ব্যয়ের সুযোগ থাকতে পারে।
বিমানযোগে ভ্রমণের ক্ষেত্রে গন্তব্যস্থলের সঙ্গে বিমানবন্দরের অবস্থান বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে।
নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে ভাতা কাঠামোর সম্পর্ক
সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বর্তমানে নতুন পে-স্কেল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে গ্রেড কাঠামো, বেতন-ভাতা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধার বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে দৈনিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা ও বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতার বর্তমান কাঠামোও ভবিষ্যতে পর্যালোচনার আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন পর্যন্ত অর্থ বিভাগের প্রকাশ্য নোটিশ ও প্রজ্ঞাপন তালিকায় ২০২২ সালের পুনর্নির্ধারণের পর দৈনিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা ও বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণের নতুন কোনো পৃথক প্রজ্ঞাপন পাওয়া যায়নি। বরং পরবর্তী বছরগুলোতে মূলত বিল দাখিলসংক্রান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছে।
এ কারণে বর্তমান সময়ে সরকারি কর্মচারীদের এসব ভাতা হিসাবের ক্ষেত্রে ২০২২ সালের নির্ধারিত হারই গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর্মচারীদের জন্য মূল বার্তা
সার্বিকভাবে বলা যায়, দৈনিক ভাতা, ভ্রমণ ভাতা ও বদলিজনিত ভ্রমণ ভাতার ক্ষেত্রে ২০২২ সালের পুনর্নির্ধারিত হারই বর্তমানে কার্যকর কাঠামোর মূল ভিত্তি। নতুন কোনো প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বিদ্যমান বিধি ও নির্ধারিত হার অনুসরণ করেই বিল প্রস্তুত করতে হবে।
অর্থ বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের এই পুনর্নির্ধারণের প্রজ্ঞাপন সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেটির পরবর্তী সময়ে বিল দাখিলসংক্রান্ত নোটিশও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে “নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনোভাবেই এই হার পরিবর্তন হবে না”—এমন নির্দিষ্ট ভাষার কোনো সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং বর্তমান প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য প্রশাসনিক অবস্থান হিসেবে দেখা বেশি নিরাপদ। নতুন পে-স্কেল বা অর্থ বিভাগের নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হলে দৈনিক ও ভ্রমণ ভাতার কাঠামো পুনর্নির্ধারিত হতে পারে।



