সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা: ৩ মাস নাকি ১ মাসের মূল বেতন—প্রকৃত নিয়ম কী?

সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিতে চাইলে কত মাসের মূল বেতন সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে—এ নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভ্রান্তি রয়েছে। কোথাও তিন মাসের মূল বেতনের কথা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও এক মাসের মূল বেতন জমা দিয়ে ইস্তফা গ্রহণের নজির পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—স্থায়ী সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিলে আসলে তিন মাসের বেতন দিতে হয়, নাকি এক মাসের?

বিষয়টি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুই ধরনের ব্যবস্থাই বাস্তবে দেখা যায়; তবে এটি সব সরকারি কর্মচারীর জন্য একই হারে নির্ধারিত কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয়। চাকরির ধরন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর/অধিদপ্তরের বিধান এবং বিশেষ করে নিয়োগপত্র বা প্রযোজ্য চাকরির শর্তের ওপর ইস্তফার ক্ষেত্রে নোটিশের মেয়াদ ও অর্থ জমার বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।

সরকারি চাকরি আইন কী বলছে?

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিকালীন সময়ে স্বেচ্ছায় ইস্তফার আবেদন করতে পারবেন এবং তা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নিষ্পত্তি বা চূড়ান্ত করবে। অর্থাৎ আইনটি নিজে প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে সরাসরি ‘তিন মাসের মূল বেতন’ বা ‘এক মাসের মূল বেতন’—এমন একটি অভিন্ন অঙ্ক নির্ধারণ করে দেয়নি।

এখানেই মূল বিষয়টি নিহিত। অর্থাৎ ইস্তফার আর্থিক শর্ত নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট চাকরির নিয়োগপত্র, সার্ভিস রুলস, বিধিমালা, সরকারি আদেশ বা দপ্তরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া দেখতে হবে।

তিন মাসের নিয়ম কোথা থেকে এলো?

প্রশ্নকারী যে নথিটি দিয়েছেন, সেটি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের আওতাধীন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি দাপ্তরিক চিঠি। নথিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেসব কর্মচারীর চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয়েছে এবং যারা সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দিতে চান, তাদের ক্ষেত্রে তিন মাসের মূল বেতন সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার চালান অথবা নির্ধারিত সময় আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নোটিশ/অবহিতকরণের ব্যবস্থা রয়েছে।

অর্থাৎ, ওই দপ্তরের ক্ষেত্রে তিন মাসের নোটিশের শর্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় আগে কর্তৃপক্ষকে জানানো না হলে অর্থ জমার বিষয়টি সামনে আসে।

তবে এটিকে বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি চাকরির জন্য বাধ্যতামূলক ‘তিন মাসের বেতন’ নিয়ম হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

তাহলে এক মাসের মূল বেতন জমা দেওয়ার ঘটনা কেন দেখা যায়?

সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি নথি বিশ্লেষণ করলে এক মাসের নিয়মের একাধিক উদাহরণ পাওয়া যায়।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রকাশিত সেবা-প্রদান প্রতিশ্রুতিতে গ্রেড-৯ বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা এবং গ্রেড-১১ থেকে ২০-এর কর্মচারীদের চাকরি থেকে ইস্তফার ক্ষেত্রে তিন মাস আগে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় আগে অবহিত না করলে এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। একই নথিতে বলা হয়েছে, আগে থেকেই অবহিতকরণের পত্র দেওয়া থাকলে ওই এক মাসের মূল বেতন জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কারণ এখানে দেখা যাচ্ছে—নোটিশের সময় তিন মাস হলেও নোটিশ না দেওয়ার আর্থিক বিকল্প এক মাসের মূল বেতন।

অর্থাৎ ‘তিন মাস আগে জানাতে হবে’ এবং ‘তিন মাসের বেতন জমা দিতে হবে’—এই দুটি বিষয় সব ক্ষেত্রে একই অর্থ বহন করে না।

আবার কোথাও নিয়োগপত্রেই এক মাসের নিয়ম রয়েছে

সরকারি গেজেটে প্রকাশিত বিভিন্ন নিয়োগের শর্তেও এক মাসের নোটিশের বিধান দেখা যায়। ২০১৫ সালের একটি সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে হলে ইস্তফার তারিখের এক মাস আগে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে; অন্যথায় এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সরকারি খাতে জমা দিতে হবে।

২০২১ সালের আরেকটি সরকারি গেজেটেও একই ধরনের শর্ত পাওয়া যায়—ইস্তফার এক মাস আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, অন্যথায় এক মাসের সমপরিমাণ টাকা সরকারি খাতে জমা দিতে হবে।

এমনকি ২০২৪ সালের একটি সরকারি গেজেটেও চাকরিতে ইস্তফা দিতে চাইলে এক মাস আগে নোটিশ অথবা এক মাসের সমপরিমাণ বেতন সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার শর্ত দেখা যায়।

স্থায়ী হলেই কি তিন মাসের বেতন বাধ্যতামূলক?

না—শুধু চাকরি স্থায়ী হয়েছে বলেই দেশের সব সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তিন মাসের মূল বেতন জমা দিতে হবে—এমন সার্বজনীন বিধান পাওয়া যায় না।

স্থায়ীকরণ চাকরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও ইস্তফার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্তটি নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট চাকরির আইন, বিধিমালা, নিয়োগপত্র বা পরবর্তী সরকারি আদেশ অনুযায়ী।

এ কারণে একজন সরকারি কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর তিন মাসের শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে, আবার অন্য কোনো দপ্তরের কর্মচারীর ক্ষেত্রে নিয়োগপত্রে এক মাসের নোটিশ বা এক মাসের বেতনের শর্ত থাকতে পারে।

‘নোটিশ’ আর ‘বেতন জমা’—দুটির সম্পর্ক কী?

সহজ ভাষায় বিষয়টি এভাবে বোঝা যায়—

১. যদি নিয়োগপত্র/প্রযোজ্য বিধানে ১ মাসের নোটিশ থাকে:
এক মাস আগে লিখিতভাবে জানিয়ে ইস্তফা দিলে সাধারণত অতিরিক্ত এক মাসের বেতন জমা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। নির্ধারিত সময়ের আগে ইস্তফা কার্যকর করতে চাইলে এক মাসের মূল বেতন জমার শর্ত থাকতে পারে।

২. যদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ৩ মাস আগে অবহিত করার শর্ত থাকে:
তিন মাস আগে নোটিশ দিয়ে ইস্তফা কার্যকর করা হলে আলাদা অর্থ জমার প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু নোটিশ না দিয়ে দ্রুত অব্যাহতি চাইলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিধান অনুযায়ী অর্থ জমা দেওয়ার শর্ত আসতে পারে।

৩. নিয়োগপত্রে আলাদা শর্ত থাকলে:
সেটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৫৩ ধারাই ইস্তফাকে সরকার-নির্ধারিত শর্তের অধীন করেছে।

একই সরকারি চাকরিতে ভিন্ন অঙ্ক কেন দেখা যায়?

এর প্রধান কারণ হলো সব সরকারি পদ একই নিয়োগবিধি বা একই শর্তে পরিচালিত হয় না।

কোনো পদ সরাসরি রাজস্ব খাতের সরকারি পদ হতে পারে, কোনো পদ বিশেষ বিধিমালা দ্বারা পরিচালিত হতে পারে, আবার কোনো দপ্তরের নিয়োগপত্রে ইস্তফার জন্য আলাদা নোটিশের শর্ত থাকতে পারে। ফলে শুধু ‘সরকারি চাকরি’ শব্দটি দেখেই ইস্তফার অর্থনৈতিক দায় নির্ধারণ করা ঠিক নয়।

উদাহরণ হিসেবে, সরকারি গেজেটের বিভিন্ন নিয়োগ শর্তে এক মাসের নোটিশ ও এক মাসের বেতনের বিধান পাওয়া যায়।

অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বর্তমান সেবা-প্রক্রিয়ায় তিন মাস আগে অবহিতকরণের কথা থাকলেও নোটিশ না থাকলে এক মাসের মূল বেতন জমার বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্নে দেখানো চট্টগ্রামের চিঠির ব্যাখ্যা কী?

প্রশ্নে দেওয়া চিঠিটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল/নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ইস্তফা প্রক্রিয়ার দাপ্তরিক নির্দেশনা হিসেবে দেখা উচিত।

এটি প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে চাকরি স্থায়ীকরণের পর স্বেচ্ছায় ইস্তফার সময় তিন মাসের নোটিশ/অর্থ সংক্রান্ত শর্ত কার্যকর করা হচ্ছে। কিন্তু এই একটি চিঠির ভিত্তিতে দেশের সব মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য একই নিয়ম ঘোষণা করা যাবে না।

চাকরি ছাড়ার আগে কী করবেন?

সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শুধু ‘এক মাস’ বা ‘তিন মাস’ শুনে চালান জমা দেওয়া উচিত নয়। প্রথমে—

  • নিয়োগপত্রের ইস্তফা সংক্রান্ত শর্ত দেখতে হবে;
  • সংশ্লিষ্ট চাকরির নিয়োগবিধি/সার্ভিস রুলস দেখতে হবে;
  • চাকরি স্থায়ীকরণের আদেশে কোনো বিশেষ শর্ত আছে কি না দেখতে হবে;
  • সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন/সংস্থাপন শাখা থেকে লিখিতভাবে জানতে হবে;
  • দেনা-পাওনা, সরকারি ঋণ, অগ্রিম, প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত দায় বা অন্য কোনো আর্থিক দায় আছে কি না যাচাই করতে হবে;
  • ইস্তফার কার্যকর তারিখ এবং নোটিশের তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

কারণ সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী ইস্তফা শেষ পর্যন্ত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নির্ধারিত শর্তে নিষ্পত্তি হয়।

মূল কথা

সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় ইস্তফার ক্ষেত্রে ‘সবাইকে তিন মাসের মূল বেতন জমা দিতে হবে’—এমন সার্বজনীন নিয়ম নেই। আবার ‘সবাই শুধু এক মাসের বেতন দিলেই হবে’—এ কথাও সঠিক নয়।

প্রকৃত নিয়ম হলো—সংশ্লিষ্ট চাকরির নিয়োগপত্র, নিয়োগবিধি, সার্ভিস রুলস এবং দপ্তরের প্রযোজ্য সরকারি আদেশ অনুযায়ী নোটিশের মেয়াদ ও অর্থ জমার পরিমাণ নির্ধারিত হবে।

আপনার দেওয়া চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নথিতে স্থায়ীকৃত কর্মচারীদের জন্য তিন মাসের শর্ত দেখা গেলেও, সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য এবং বিভিন্ন সরকারি গেজেটে এক মাসের মূল বেতন/এক মাসের নোটিশের উদাহরণও রয়েছে।

তাই এক মাসের মূল বেতন জমা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারীর ইস্তফা গৃহীত হওয়ার ঘটনা নিজেই ভুল বা অবৈধ প্রমাণ করে না; বরং দেখতে হবে ওই কর্মচারীর নিয়োগপত্র ও প্রযোজ্য বিধানে কী শর্ত ছিল। একইভাবে, কোনো দপ্তর যদি স্থায়ীকৃত কর্মচারীর জন্য তিন মাসের মূল বেতন বা তিন মাসের পূর্বনোটিশের শর্ত দেয়, সেটিও সংশ্লিষ্ট চাকরির প্রযোজ্য বিধান/শর্তের ভিত্তিতে বৈধ হতে পারে।

সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো—‘এক মাস না তিন মাস’—এ প্রশ্নের উত্তর চাকরির নাম ও দপ্তরভেদে আলাদা হতে পারে; চূড়ান্ত উত্তর দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর নিয়োগপত্র ও প্রযোজ্য বিধান দেখতে হবে।

সোর্স ফাইল

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *