ইউনিয়নে মা ও শিশু ভাতা: ২০–৩৫ বছর বয়সী নারীদের জন্য কী সুযোগ, কারা পাবেন
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রচারপত্রে দাবি করা হচ্ছে, ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ৩৬ মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা করে ভাতা পেতে পারেন। পোস্টটিতে আরও বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের করটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করতে হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘১০০ শতাংশ টাকা নিশ্চিত’, ‘শুধু বয়স ২০–৩৫ হলেই হবে’ কিংবা ‘১–৫ বছর বয়সী সন্তান থাকলেও কোনো সমস্যা নেই’—এ ধরনের বক্তব্যকে সরকারি অনুমোদন বা নিশ্চিত ভাতা পাওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। সরকারি কর্মসূচিতে আবেদনকারীর বয়সের পাশাপাশি গর্ভাবস্থা, সন্তানসংখ্যা, আর্থিক অবস্থা, সম্পদ ও অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই করে চূড়ান্তভাবে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়।
মাসে ৮৫০ টাকা, ৩৬ মাসে মোট ৩০ হাজার ৬০০ টাকা
‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে এ কর্মসূচির মাসিক ভাতার হার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশুকে মাসে ৮৫০ টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন নির্বাচিত উপকারভোগী সর্বোচ্চ ৩৬ মাস এই সহায়তা পেলে হিসাব দাঁড়ায়—
৮৫০ টাকা × ৩৬ মাস = ৩০ হাজার ৬০০ টাকা।
অর্থাৎ, প্রচারপত্রে উল্লেখ করা ৩৬ মাসের হিসাবটি বর্তমান মাসিক ৮৫০ টাকা হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে কোনো আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো ৩৬ মাসের টাকা পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই; সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্বাচিত উপকারভোগীর ক্ষেত্রেই সুবিধা কার্যকর হয়।
শুধু ২০–৩৫ বছর বয়স হলেই কি ভাতা পাওয়া যাবে?
না। বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত হলেও এটিই একমাত্র শর্ত নয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতায় সাধারণত প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণের ক্ষেত্রে আবেদন বিবেচনা করা হয়। আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা, দরিদ্রতা, ভূমি ও সম্পদের পরিস্থিতি এবং গর্ভাবস্থার তথ্যও যাচাই করা হয়। কিছু সরকারি দপ্তরের প্রকাশিত নির্দেশনায় আবেদনকালে নির্দিষ্ট সময়ের গর্ভবতী থাকা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাধ্যমে গর্ভাবস্থার তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে।
তাই ‘২০–৩৫ বছর বয়স হলেই হবে’—এটি অসম্পূর্ণ তথ্য।
সন্তান ১–৫ বছর বয়সী হলে কি আবেদন করা যাবে?
এখানেই প্রচারপত্রের সঙ্গে সরকারি যোগ্যতার পার্থক্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছবিতে বলা হয়েছে, ‘বাচ্চার বয়স ১–৫ বছর থাকলেও সমস্যা নাই’। কিন্তু মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির প্রচলিত সরকারি যোগ্যতার বর্ণনায় আবেদনের সময় গর্ভবতী থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গর্ভকাল পূরণ করার পর আবেদন করার বিধানও সরকারি তথ্যের বিভিন্ন সংস্করণে রয়েছে।
ফলে শুধু ১ থেকে ৫ বছর বয়সী সন্তান রয়েছে—এমন নারীকে বয়সের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাতার যোগ্য বলা যাবে না। বর্তমান চক্রে করটিয়া ইউনিয়নে ঠিক কোন শ্রেণির আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে, তা স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা/ইউনিয়ন পরিষদের সর্বশেষ নোটিশ দেখে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?
প্রচারপত্রে কয়েকটি প্রয়োজনীয় নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গেও এগুলোর বেশিরভাগের মিল রয়েছে।
সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে—
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি;
- গর্ভাবস্থার প্রমাণপত্র বা ANC কার্ড;
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট;
- স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি;
- আবেদনকারীর নিজ নামে মোবাইল ব্যাংকিং/ব্যাংক হিসাব;
- প্রয়োজনীয় জন্মনিবন্ধন বা নাগরিকত্বের প্রমাণ;
- স্বাস্থ্য বা পরিবার পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের গর্ভকালীন সনদ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী নির্বাচিত উপকারভোগীর অর্থ G2P পদ্ধতিতে নির্ধারিত হিসাব নম্বরে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ কারও হাতে নগদ টাকা দেওয়ার কথা নয় এবং ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে ব্যক্তিগতভাবে টাকা নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।
‘১০০% টাকা পাবেন’—এই দাবির বাস্তবতা কী?
এখানে আবেদনকারীদের বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কোনো সরকারি ভাতা কর্মসূচিতে শুধু আবেদন করলেই ১০০ শতাংশ নিশ্চিতভাবে টাকা পাওয়া যায় না। আবেদন গ্রহণের পর যাচাই-বাছাই, স্থানীয় পর্যায়ের সুপারিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ইউনিয়ন পর্যায়ে আবেদন যাচাই করে পরবর্তী পর্যায়ে পাঠানো এবং MIS-এর মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করার প্রক্রিয়া রয়েছে।
অতএব, ‘আবেদন করলেই নিশ্চিত ৩০ হাজার ৬০০ টাকা’—এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
আবেদন করতে টাকা লাগবে কি?
সরকারি সেবার তথ্য অনুযায়ী মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আবেদন বিনামূল্যে। সরকারি তথ্যেও প্রয়োজনীয় ফি ‘বিনামূল্যে’ উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই কেউ যদি বলেন—‘ভাতা করে দিতে আগে টাকা দিতে হবে’, তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত। সরকারি ভাতা পাওয়ার জন্য ঘুষ বা ব্যক্তিগত কমিশন দেওয়ার কোনো বৈধ নিয়ম নেই।
করটিয়া ইউনিয়নের ক্ষেত্রে কী করবেন?
করটিয়া ইউনিয়ন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার একটি ইউনিয়ন এবং এর সরকারি ইউনিয়ন পরিষদ পোর্টাল সক্রিয় রয়েছে।
যারা করটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং এই কর্মসূচির জন্য যোগ্য হতে পারেন, তারা প্রথমে—
১. নিজের বয়স ও NID-এর তথ্য যাচাই করুন।
২. বর্তমানে গর্ভবতী হলে গর্ভকাল কত সপ্তাহ হয়েছে তা নিশ্চিত করুন।
৩. প্রথম বা দ্বিতীয় গর্ভধারণের শর্ত প্রযোজ্য কি না যাচাই করুন।
৪. ANC কার্ড ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কাগজ প্রস্তুত রাখুন।
৫. নিজের নামে সক্রিয় ব্যাংক/মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস হিসাব রাখুন।
৬. করটিয়া ইউনিয়ন পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কাছ থেকে চলমান আবেদন ও কোটা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
৭. কোনো দালালকে ‘ভাতা নিশ্চিত’ করার নামে টাকা দেবেন না।
করটিয়া ইউনিয়নের সরকারি পোর্টালে ইউনিয়ন পরিষদের নারী ও শিশু কল্যাণসংক্রান্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
শেষ কথা
করটিয়া ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে প্রচারিত পোস্টটি অনেক নারীর মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। ২০–৩৫ বছর বয়স, ৩৬ মাস এবং মাসে ৮৫০ টাকা—এই তথ্যগুলো মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, ‘শুধু বয়স ২০–৩৫ হলেই হবে’ বা ‘১০০ শতাংশ নিশ্চিত টাকা পাবেন’—এমন সরলীকরণ ঠিক নয়।
বিশেষ করে সন্তানের বয়স ১–৫ বছর হলেই যে বর্তমান নিয়মে নতুন করে ভাতা পাওয়া যাবে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আবেদনকারীর বর্তমান গর্ভাবস্থা, প্রথম/দ্বিতীয় গর্ভধারণ, আর্থিক অবস্থা ও অন্যান্য সরকারি শর্ত পূরণ করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন হতে হবে।
সুতরাং করটিয়া ইউনিয়নের নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরামর্শ হলো—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে কাউকে টাকা না দিয়ে সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে সর্বশেষ আবেদন বিজ্ঞপ্তি ও যোগ্যতার তালিকা যাচাই করে আবেদন করা।



