মাতৃত্বকালীন ছুটিতে পে-স্কেলের বকেয়া বেতন-ভাতা কি পাওয়া যাবে? সিএজি কার্যালয়ের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট ব্যাখ্যা
সরকারি চাকরিতে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা অবস্থায় নতুন জাতীয় বেতনস্কেল কার্যকর হলে ওই ছুটির সময়ের জন্য নতুন বেতনস্কেলের আর্থিক সুবিধা বা বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়ে অনেক কর্মচারীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।
২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর তারিখে জারি করা সংশ্লিষ্ট চিঠিতে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা একজন সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ কার্যকর করার পদ্ধতি এবং ছুটিকালীন আর্থিক সুবিধা নিয়ে মতামত দেওয়া হয়। নথিতে The Prescribed Leave Rules, 1959-এর Rule-6(1) এবং জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
সিএজি কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত কী?
সংশ্লিষ্ট নথির মূল বক্তব্য হলো—১ জুলাই ২০১৫ তারিখে কোনো কর্মচারী ছুটিতে থাকলেও তার বেতন জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। তবে নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের কারণে যে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি হবে, সেটি ছুটিতে থাকার সময়ের জন্য প্রাপ্য হবে না।
অর্থাৎ, এখানে দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখতে হবে—
প্রথমত, বেতন নির্ধারণ।
কর্মচারী ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে ছুটিতে থাকলেও তার বেতন নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, ছুটিকালীন আর্থিক সুবিধা।
নতুন বেতনস্কেলের কারণে যে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে, তা ওই কর্মচারী ছুটিতে থাকার সময়ের জন্য বকেয়া হিসেবে দেওয়া হবে না।
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর গেজেটেও একই বিধান
জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর সরকারি গেজেটে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছিল। গেজেটের সংশ্লিষ্ট দফায় বলা হয়েছে, ওই তারিখে ছুটিতে থাকা কর্মচারীর বেতন তার বর্তমান বেতনের ভিত্তিতে অথবা তিনি ছুটিতে না থাকলে যে বেতন পেতেন, সেই ভিত্তিতে জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এ নির্ধারণ করতে হবে। তবে ওই বেতন নির্ধারণের ফলে যে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, তা ছুটির সময়ের জন্য প্রাপ্য হবে না।
আপলোড করা সরকারি গেজেটের কপিতেও একই বিধান স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সেখানে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি ছুটিকালীন আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
তাহলে মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়া যাবে কি?
সিএজি কার্যালয়ের ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, না—মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার সময়ের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বকেয়া হিসেবে দাবি করা যাবে না।
ধরা যাক, কোনো নারী সরকারি কর্মচারী ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। পরে জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী তার বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হলো। এ ক্ষেত্রে তার নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণ হবে; কিন্তু তিনি যে সময় মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন, সেই সময়ের জন্য নতুন স্কেলের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা বা বেতনবৃদ্ধির পার্থক্য বকেয়া হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকবে না—সিএজি কার্যালয়ের নথিতে এমন মতামতই দেওয়া হয়েছে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত?
এর পেছনে মূল বিষয় হলো ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণের বিধান। সংশ্লিষ্ট চিঠিতে The Prescribed Leave Rules, 1959-এর Rule-6(1)-এর উল্লেখ করে ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণের বিধান বিবেচনা করা হয়েছে। নথিতে বলা হয়েছে, ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে এবং নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা ছুটিকালীন সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে
এখানে “বেতন পুনর্নির্ধারণ” এবং “ছুটিকালীন বকেয়া পাওনা” এক বিষয় নয়।
কর্মচারীর বেতন নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে নির্ধারণ করা হতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ছুটির পুরো সময়ের জন্য নতুন স্কেলের অতিরিক্ত টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বকেয়া হিসেবে দিতে হবে।
২০১৫ সালের গেজেটের ভাষ্যও ঠিক এই পার্থক্যটি তৈরি করেছে—বেতন নির্ধারণ হবে, কিন্তু সেই বেতন নির্ধারণের ফলে সৃষ্ট আর্থিক সুবিধা ছুটির সময়ের জন্য প্রাপ্য হবে না।
যোগদানের পর কী হবে?
সিএজি কার্যালয়ের সিদ্ধান্তের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছুটি শেষে কর্মচারী কর্মস্থলে যোগদানের পর নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন কাঠামো কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ ছুটিকালীন সময়ের আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার বিধানটি নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের বিষয়টিকে বাতিল করে না।
সহজভাবে বলা যায়—
ছুটিতে থাকা অবস্থায়:
নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা ছুটির সময়ের জন্য প্রাপ্য নয়।
ছুটি শেষে কাজে যোগদানের পর:
নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত নতুন স্কেলের বেতন কার্যকর থাকবে।
একটি উদাহরণ
ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মচারী ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কয়েক মাসের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলেন। ওই সময় জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ কার্যকর হলো।
পরে তার বেতন নতুন স্কেলে নির্ধারণ করা হলো। কিন্তু তিনি জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাস মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন।
এ ক্ষেত্রে নতুন স্কেলের কারণে জুলাই-সেপ্টেম্বরের বেতন পার্থক্যকে ছুটিকালীন বকেয়া হিসেবে দাবি করা যাবে না। তবে তার বেতন নতুন জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত থাকবে এবং কর্মস্থলে যোগদানের পর সংশ্লিষ্ট নিয়মে সেই বেতন প্রযোজ্য হবে।
শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটি নয়, “ছুটিতে থাকা” বিষয়টিই মূল
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গেজেটের বিধানটি শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটিকে আলাদাভাবে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি; বরং ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে যে কর্মচারী ছুটিতে ছিলেন, তাদের জন্য সাধারণ বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে সিএজি কার্যালয়ের ব্যাখ্যাটি মূলত জাতীয় বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখে ছুটিতে থাকা কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ ও ছুটিকালীন আর্থিক সুবিধার সম্পর্ক নিয়ে।
অন্যদিকে মাতৃত্বকালীন ছুটি নিজেই সরকারি চাকরিতে পূর্ণ বেতনের নির্দিষ্ট ছুটি হিসেবে স্বীকৃত। ২০১১ সালের সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ পূর্ণ বেতনে ছয় মাস করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
সবকিছু মিলিয়ে সিএজি কার্যালয়ের নথি ও জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর গেজেট থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয় তা হলো—
১. ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকলেও কর্মচারীর বেতন জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে।
২. নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের ফলে যে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে, তা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকার সময়ের জন্য প্রাপ্য নয়।
৩. ফলে ছুটিকালীন সময়ের নতুন পে-স্কেলের বেতন পার্থক্যকে বকেয়া হিসেবে দাবি করার সুযোগ নেই—সিএজি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মতামত এটাই নির্দেশ করে।
৪. ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগদানের পর নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন কার্যকর থাকবে, সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসারে।
৫. জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর ক্ষেত্রে এই বিধান সরাসরি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত ছিল; তাই শুধু “পে-স্কেল কার্যকর হয়েছে” বলেই ছুটিকালীন সময়ের বেতন পার্থক্য বকেয়া পাওনা হয়ে যায় না।
বর্তমান সময়ে একটি সতর্কতা
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। সিএজি কার্যালয়ের এই সিদ্ধান্তটি জাতীয় বেতনস্কেল, ২০১৫-এর বিধান ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছিল। তাই ভবিষ্যতের কোনো নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে একই ধরনের বিষয় উঠলে নতুন গেজেটে কী বলা হয়েছে, সেটিই চূড়ান্তভাবে দেখতে হবে। ২০১৫ সালের এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি ভবিষ্যৎ পে-স্কেলের বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সুতরাং, কোনো সরকারি নারী কর্মচারী যদি মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় পে-স্কেলের বকেয়া বেতন-ভাতা পাওয়ার বিষয়ে আবেদন করেন, তাহলে তার ছুটির ধরন, ছুটির শুরুর তারিখ, সংশ্লিষ্ট পে-স্কেলের গেজেট এবং সেই পে-স্কেলের নির্দিষ্ট বিধান মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ২০১৫ সালের ক্ষেত্রে সিএজি কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত ও সরকারি গেজেট—দুটিই ছুটিকালীন নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার দিকেই স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়।



