পে ফিক্সেশন ২০২৬: ১ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে শুরু, সারা দেশে কার্যক্রম চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে দেশের সব সরকারি কর্মচারীর জন্য একই দিনে পে ফিক্সেশন চালু হচ্ছে না। হিসাবরক্ষণ কার্যালয় ও অঞ্চলভিত্তিক ধাপে ধাপে iBAS++-এর Pay Fixation sub-system-এ এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে প্রথম ধাপে নির্ধারিত কিছু হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পে ফিক্সেশন শুরু হয়েছে। এরপর ৫, ৮, ১২, ১৫ ও ১৮ অক্টোবর পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এ কার্যক্রমের আওতায় আসবে। ফলে ‘সারা দেশে পে ফিক্সেশন কবে থেকে?’—এর সরল উত্তর হলো, ১ অক্টোবর থেকে কার্যক্রমের প্রথম ধাপ শুরু হলেও অধিকাংশ মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মচারীর জন্য নির্ধারিত তারিখ ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে এবং ১৮ অক্টোবরের মধ্যে সব বিভাগকে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
১ অক্টোবর থেকেই কি সবার পে ফিক্সেশন শুরু?
না। ১ অক্টোবরকে সবার জন্য পে ফিক্সেশন শুরুর তারিখ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ভুল বোঝার সুযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত সময়সূচিতে প্রথম ধাপে নির্দিষ্ট কিছু হিসাবরক্ষণ কার্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সিএএফও, ডিএও এবং ইউএও কার্যালয়কে যুক্ত করা হবে। অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারী কোন হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের আওতাধীন, তার ওপর নির্ভর করবে তিনি কোন তারিখ থেকে iBAS++-এ পে ফিক্সেশন করতে পারবেন।
বিভাগভিত্তিক পে ফিক্সেশনের সম্ভাব্য সময়সূচি
প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে কার্যক্রমের চিত্র হলো—
| তারিখ | আওতাভুক্ত এলাকা/কার্যালয় | ১ অক্টোবর ২০২৬ | ঢাকা বিভাগের নির্ধারিত সিএএফও, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও নির্ধারিত ডিএএফও কার্যালয় | ৫ অক্টোবর ২০২৬ | ঢাকার সংশ্লিষ্ট সিএএফও/হিসাবরক্ষণ কার্যালয় | ৮ অক্টোবর ২০২৬ | ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের সংশ্লিষ্ট ডিএও/ইউএও কার্যালয় | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | চট্টগ্রাম বিভাগের সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় | ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | ময়মনসিংহ ও রংপুরসহ নির্ধারিত অঞ্চলের হিসাবরক্ষণ কার্যালয় | ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় |
|---|
অর্থাৎ, একদিনে সারা দেশের সব সরকারি কর্মচারীর পে ফিক্সেশন চালু হচ্ছে না। বরং iBAS++ সিস্টেমের সক্ষমতা ও হিসাবরক্ষণ কার্যালয়গুলোর প্রস্তুতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন শেষ করার প্রস্তুতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কারণ নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধের হিসাব চূড়ান্ত করতে এর আগেই কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণ প্রয়োজন।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পে ফিক্সেশনের সময় কর্মচারীর ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যের সঙ্গে অফিস আদেশ বা সার্ভিস রেকর্ডের অসঙ্গতি থাকলে পরবর্তী যাচাইয়ের সময় সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
কীভাবে হবে iBAS++ পে ফিক্সেশন?
নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারীকে iBAS++-এর পে ফিক্সেশন মডিউলে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ও প্রদান করতে হবে।
সাধারণভাবে যেসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য;
- নাম ও জন্মতারিখ;
- বর্তমান পদ ও গ্রেড;
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ;
- ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বিদ্যমান মূল বেতন;
- পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশনের তথ্য;
- ইনক্রিমেন্টের তথ্য;
- পদোন্নতির তথ্য;
- উচ্চতর গ্রেডের তথ্য;
- টাইমস্কেল বা সিলেকশন গ্রেডের তথ্য, যেখানে প্রযোজ্য;
- সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ ও চাকরিসংক্রান্ত নথি।
তথ্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় তা যাচাই করবে। যাচাই শেষে পে ফিক্সেশন অনুমোদন হলে সিস্টেমে নতুন বেতন নির্ধারণের তথ্য সংরক্ষিত হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদনের পর iBAS++ থেকে একটি ভেরিফিকেশন নম্বর তৈরি হওয়ার কথা রয়েছে এবং সেটি সার্ভিস বহিতে লিপিবদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকবে।
ভুল তথ্য দিলে কী হতে পারে?
পে ফিক্সেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চাকরির পূর্ববর্তী তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের সামঞ্জস্য।
বিশেষ করে পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট বা পূর্ববর্তী বেতন নির্ধারণের কোনো তথ্য বাদ পড়লে নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই iBAS++-এ তথ্য দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর সার্ভিস বুক, পূর্ববর্তী পে ফিক্সেশন, অফিস আদেশ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি মিলিয়ে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও চলছে
পে ফিক্সেশন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের অনলাইন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের এসপিএফএমএস কর্মসূচির আওতায় iBAS++-এর মাধ্যমে পরিচালিত এই প্রশিক্ষণে সিএএফও, ডিসিএ, ডিএএফও ও ইউএও কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নিচ্ছেন।
এতে বোঝা যাচ্ছে, পে ফিক্সেশন চালুর আগে শুধু সফটওয়্যার প্রস্তুত করাই নয়, মাঠপর্যায়ের হিসাবরক্ষণ কার্যালয়গুলোকেও একই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
জুলাই থেকে কার্যকর, এখন বেতন নির্ধারণ
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর এখন প্রত্যেক কর্মচারীর ক্ষেত্রে পুরোনো বেতন কাঠামো থেকে নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের কাজটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামোর আইনি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলেও প্রত্যেক কর্মচারীর নির্দিষ্ট নতুন মূল বেতন নির্ধারণের জন্য পে ফিক্সেশন প্রয়োজন।
বকেয়া বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রেও পে ফিক্সেশন গুরুত্বপূর্ণ
নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সময়ের বকেয়া বা এরিয়ার হিসাব তৈরির জন্যও পে ফিক্সেশন গুরুত্বপূর্ণ। কার কত বকেয়া হবে, তা নির্ভর করবে তার পুরোনো মূল বেতন, নতুন স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন, কার্যকর সময় এবং সংশ্লিষ্ট বেতন-ভাতার হিসাবের ওপর।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পে ফিক্সেশন শেষ হওয়ার পর হিসাব অনুযায়ী প্রায় তিন মাসের বকেয়া একসঙ্গে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তবে সবার বকেয়ার পরিমাণ সমান হবে না; ব্যক্তিভেদে বেতন ও চাকরির তথ্যের ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের এখন কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?
পে ফিক্সেশনের নির্ধারিত তারিখ আসার আগে সরকারি চাকরিজীবীদের কয়েকটি বিষয় যাচাই করে রাখা প্রয়োজন।
প্রথমত, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে নিজের মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।
দ্বিতীয়ত, পূর্বের পে ফিক্সেশন, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড বা অন্য কোনো বেতন নির্ধারণ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নাম, এনআইডি, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও চাকরিতে যোগদানের তারিখে কোনো ভুল আছে কি না তা যাচাই করা জরুরি।
চতুর্থত, নিজের আওতাধীন হিসাবরক্ষণ কার্যালয় কোন তারিখ থেকে পে ফিক্সেশন গ্রহণ করবে, সেটি নিশ্চিত হয়ে তারপর iBAS++-এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা উচিত।
চূড়ান্ত কথা
নবম জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে সরকার। ১ অক্টোবর থেকে নির্দিষ্ট কার্যালয়ে পে ফিক্সেশন শুরু হলেও এটি সারা দেশের জন্য একযোগে চালু হচ্ছে না। প্রকাশিত সময়সূচি অনুযায়ী ৫ অক্টোবর থেকে ঢাকার বিভিন্ন হিসাবরক্ষণ কার্যালয় এবং ৮ অক্টোবর থেকে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমসহ পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগ যুক্ত হবে। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে দেশের বাকি অঞ্চলগুলো কার্যক্রমের আওতায় আসার কথা রয়েছে।
এরপর ২০ অক্টোবরের মধ্যে পে ফিক্সেশন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি রয়েছে, যাতে নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন ও সংশ্লিষ্ট বকেয়ার হিসাব চূড়ান্ত করা যায়।
তবে বিভাগভিত্তিক তারিখ নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন প্রতিবেদনে সামান্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তাই কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে তার অধীনস্থ হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনাকেই চূড়ান্ত হিসেবে অনুসরণ করা উচিত। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরও ১ অক্টোবর iBAS++ Pay Fixation-sub-system-এ জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর বেতন নির্ধারণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাঠানোর বিষয়ে নোটিশ প্রকাশ করেছে।


