সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

নিজ জেলায় পোস্টিং কি নিষিদ্ধ? সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন নীতিমালা নিয়ে যা জানা গেল

সরকারি চাকরিতে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যেই একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—নিজ জেলার কোনো সরকারি কর্মকর্তা নাকি নিজের জেলায় পোস্টিং পেতে পারেন না। ফলে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, অসুস্থ বা বয়স্ক বাবা-মায়ের দেখাশোনা কিংবা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সহযোগিতা করার প্রয়োজন থাকলেও অনেক কর্মকর্তা নিজ জেলায় বদলি বা পদায়নের আবেদন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে শুনছেন, ‘নিজ জেলায় পোস্টিং হয় না।’

তবে সরকারি নথি ও বিভিন্ন দপ্তরের বদলি-পদায়ন নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়। সারা দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ—এমন একটি সাধারণ ও সর্বজনীন পরিপত্র পাওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, ক্যাডার ও দপ্তর নিজেদের প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক বদলি ও পদায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ—এমন সাধারণ আইন আছে কি?

সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন মূলত সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ক্ষমতার আওতাভুক্ত। কোনো নির্দিষ্ট দপ্তরের নিজস্ব বদলি/পদায়ন নীতিমালায় যদি স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে নির্দিষ্ট পদ বা গ্রেডের কর্মকর্তাকে নিজ জেলায় পদায়ন করা যাবে না, তাহলে সেই কর্মকর্তা ওই নীতির আওতায় পড়বেন।

কিন্তু একটি দপ্তরের নিয়মকে দেশের সব সরকারি দপ্তরের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ নিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২০২০ সালের বদলি/পদায়ন নীতিমালা। সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলীদের নিজ জেলা ছাড়া অন্য জেলায় এবং সহকারী প্রকৌশলী/উপসহকারী প্রকৌশলীদের নিজ উপজেলা ছাড়া অন্য উপজেলায় পদায়নের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ওই দপ্তরে নির্দিষ্ট পদগুলোর ক্ষেত্রে নিজ জেলা বা নিজ উপজেলা এড়িয়ে চলার সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। একই নীতিমালায় আবার অবসর গ্রহণের এক বছর আগে আবেদনের ভিত্তিতে নিজ জেলা বা সুবিধাজনক স্থানে বদলির সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ এখানে মূল বিষয় হলো—নীতিটি দপ্তরভিত্তিক।

আবার কোথাও নিজ জেলা নিষেধ, কোথাও সুযোগও আছে

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বদলি-পদায়ন সংক্রান্ত নীতিতেও দেখা যায়, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় এবং উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাধারণত নিজ উপজেলায় নিয়োগ/বদলি/পদায়ন না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট দপ্তরে এমন নিষেধাজ্ঞা থাকা বাস্তব এবং বৈধ প্রশাসনিক নীতির অংশ হতে পারে।

অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বাস্তব কর্মস্থলের তথ্যেও দেখা যায়, নিজ জেলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মস্থলে কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। উদাহরণ হিসেবে সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্যভান্ডারে নিজ জেলা ও কর্মস্থলের তথ্য প্রকাশিত রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একেবারে একরকম নয়। অধিদপ্তর নিজেই নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ জেলার বাইরে পদায়ন বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করেছে।

আবার বর্তমানে সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা নিজ জেলা থেকে ভিন্ন জেলায় কর্মরত আছেন—যা স্বাভাবিক বদলি ব্যবস্থার অংশ।

নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে নিয়ম তুলনামূলক কঠোর

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পদে নিজ জেলা বা স্বামী/স্ত্রীর জেলায় পদায়ন না দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের পদায়ন সংক্রান্ত সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, সিনিয়র সহকারী কমিশনার পদে নিজ জেলা অথবা স্বামী/স্ত্রীর জেলায় পদায়ন করা যাবে না।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—এটি সংশ্লিষ্ট পদ ও ক্যাডারের নির্দিষ্ট পদায়ন নীতি, সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা নয়।

১০ম গ্রেডের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কী হবে?

আপনি যদি ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হন, তাহলে শুধু ‘১০ম গ্রেড’ হওয়ার কারণে নিজ জেলায় পোস্টিং আইনত নিষিদ্ধ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

আপনার ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে—

১. আপনি কোন মন্ত্রণালয়/অধিদপ্তর/দপ্তরের কর্মকর্তা।
২. আপনার পদটির জন্য কোনো আলাদা বদলি/পদায়ন নীতিমালা আছে কি না।
৩. ওই নীতিমালায় নিজ জেলা, নিজ উপজেলা বা নিজ বিভাগে পোস্টিং সম্পর্কে কী বলা হয়েছে।
৪. আপনার বর্তমান পদটি মাঠপর্যায়ের পদ কি না।
৫. আপনার নিজ জেলায় একই বা সমমর্যাদার শূন্য পদ রয়েছে কি না।
৬. বদলির আবেদন গ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল পূর্ণ হয়েছে কি না।

সুতরাং কর্তৃপক্ষ যদি শুধু মৌখিকভাবে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় পোস্টিং হয় না’, তাহলে সেটি যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। বরং আপনি বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইতে পারেন—কোন পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন বা দপ্তরের বদলি/পদায়ন নীতিমালার কোন ধারায় আপনার ক্ষেত্রে নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পরিবারের বিশেষ পরিস্থিতি কি বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে?

এখানেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী এবং বৃদ্ধ মায়ের দেখাশোনার প্রয়োজন নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও পারিবারিক বাস্তবতা। তবে শুধু এই কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নিজ জেলায় পোস্টিং দিতে হবে—এমন সর্বজনীন আইনি অধিকারও বলা যাবে না।

তবে প্রশাসনিক বিবেচনায় বিশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে বদলির আবেদন করা অবশ্যই সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নীতিমালা সেটি নিষিদ্ধ না করে।

এ ক্ষেত্রে আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী—

  • স্ত্রীর গর্ভাবস্থার চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র,
  • চিকিৎসকের পরামর্শ,
  • মায়ের বয়স ও নির্ভরশীলতার প্রমাণ,
  • নিজ জেলায় শূন্য পদের তথ্য,
  • নিজ জেলার কাছাকাছি কর্মস্থলে পদায়নের বিকল্প প্রস্তাব

দেওয়া যেতে পারে।

একই সঙ্গে আবেদনটিতে বলা যেতে পারে যে, নিজ জেলায় পদায়ন সম্ভব না হলে নিকটবর্তী জেলা/উপজেলায় পদায়নের বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক।

‘অনেক অফিসার নিজ জেলায় আছেন’—এটি কি প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একই দপ্তরে আপনার চেয়ে উচ্চতর গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা নিজ জেলায় কর্মরত আছেন—এমন উদাহরণ পাওয়া গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনারও সেখানে পোস্টিং পাওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।

কারণ তাদের ক্ষেত্রে হতে পারে—

  • ভিন্ন পদ,
  • ভিন্ন ক্যাডার,
  • ভিন্ন পদায়ন নীতি,
  • বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ,
  • পূর্বের পদায়নের ধারাবাহিকতা,
  • প্রকল্প বা সংযুক্তি,
  • বিশেষ অনুমোদন,
  • অথবা নীতিমালার ব্যতিক্রমী প্রয়োগ।

তাই ‘অমুক কর্মকর্তা নিজ জেলায় আছেন, আমাকেও দিতে হবে’—এর চেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, ‘আমার পদের ক্ষেত্রে নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ করার নির্দিষ্ট বিধানটি কোথায়?’

বাস্তব উদাহরণ কী বলছে?

সরকারি নথি থেকে দেখা যায়, একেক দপ্তরে একেক ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্দিষ্ট প্রকৌশলী পদে নিজ জেলা/উপজেলা এড়িয়ে চলার নিয়ম করেছে এবং একই নীতিতে স্বামী-স্ত্রীকে যথাসম্ভব একই বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কর্মস্থলে রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আবার পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ জেলা/উপজেলায় পদায়ন না দেওয়ার বিধান রেখেছে।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কিছু পদে নিজ জেলায় পদায়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অর্থাৎ ‘সব সরকারি কর্মকর্তা নিজ জেলায় পোস্টিং পান না’—এটি বাস্তবতার একটি অংশ; কিন্তু ‘কোনো সরকারি কর্মকর্তাই নিজ জেলায় পোস্টিং পেতে পারেন না’—এটি সঠিক সাধারণীকরণ নয়।

তাহলে করণীয় কী?

আপনার মতো ১০ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা প্রথমেই আবেগের পরিবর্তে বিধি ও নীতিমালাভিত্তিক আবেদন করাই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

আবেদনে সরাসরি লিখতে পারেন—

‘আমার পদের ক্ষেত্রে নিজ জেলায় পদায়ন নিষিদ্ধ করার কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান/পরিপত্র থাকলে তার সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ধারা অবহিত করার জন্য অনুরোধ করছি।’

এরপর উল্লেখ করতে পারেন—

‘আমার স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা এবং আমার মা বয়োবৃদ্ধ। পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিজ জেলায় অথবা সম্ভব না হলে নিকটবর্তী কোনো সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়টি মানবিক ও প্রশাসনিক বিবেচনায় নেওয়ার জন্য আবেদন করছি।’

এভাবে আবেদন করলে বিষয়টি ‘নিজ জেলায় পোস্টিং চাই’—এই সাধারণ দাবির পরিবর্তে ‘নীতিমালার মধ্যে থেকে পারিবারিক বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনার আবেদন’ হিসেবে উপস্থাপিত হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

কর্তৃপক্ষের ‘নিজ জেলায় পোস্টিং হয় না’ বক্তব্যটি সত্য কি না, তা আপনার দপ্তরের নাম ও আপনার নির্দিষ্ট পদের বদলি/পদায়ন নীতিমালা না দেখে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

তবে সরকারি নথি যাচাই করে যে বিষয়টি পরিষ্কার, তা হলো—বাংলাদেশের সব ৯ম/১০ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার জন্য নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ—এমন একটি সর্বজনীন নিয়ম নেই। কোনো কোনো ক্যাডার/দপ্তর/পদের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে, আবার অন্য ক্ষেত্রে এমন নিষেধাজ্ঞা নেই বা বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।

তাই আপনার ক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমার দপ্তরের নিজস্ব বদলি/পদায়ন নীতিমালায় আমার পদ ও গ্রেডের জন্য নিজ জেলায় পোস্টিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে কি না?’

সেই নীতিমালার নির্দিষ্ট ধারা পাওয়া গেলে আপনার আবেদনের আইনি ও প্রশাসনিক অবস্থান অনেক বেশি পরিষ্কার হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *