‘আমরা কর্মবিরতি চাই না, আমরা চাই প্রজ্ঞাপন’: ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৯ম পে-স্কেলের গেজেট চান সরকারি কর্মচারীরা
দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন দ্রুত জারির দাবিতে এবার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির প্রত্যাশা, আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। তাদের স্পষ্ট অবস্থান—কর্মবিরতি নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং দ্রুত প্রজ্ঞাপন।
সম্প্রতি পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যে অপেক্ষা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটি বলছে, তারা সংঘাত বা অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে চায় না; বরং দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক পরিবেশে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়।
২০ সেপ্টেম্বরকে গুরুত্ব দিচ্ছেন কর্মচারীরা
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া এখন তাদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হলে কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান হবে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথ আরও স্পষ্ট হবে।
এর আগে সংগঠনটি আগস্টের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছিল। ৭ আগস্টের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংগঠনটি সময়ক্ষেপণ না করে আগস্টের মধ্যেই নবম পে-স্কেলের গেজেট জারি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
এরপর ১১ আগস্ট দ্রুত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ ও বাস্তবায়নের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সময়সীমা নির্ধারণ করে দাবি জানানোর বিষয়টি হঠাৎ করে আসেনি; কয়েক মাস ধরে চলা দাবি, আলোচনা ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতার মধ্যেই এটি এসেছে।
‘কর্মবিরতি নয়, সমাধান চাই’
কল্যাণ সমিতির বর্তমান অবস্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তারা কর্মবিরতিকে প্রথম পছন্দ হিসেবে দেখছে না। বরং তাদের বক্তব্য, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায় সংগঠনটি।
তাদের অবস্থানকে সংক্ষেপে বলা যায়—
‘আমাদের লক্ষ্য আন্দোলন নয়—আমাদের লক্ষ্য সমাধান।
আমাদের লক্ষ্য কর্মবিরতি নয়—আমাদের লক্ষ্য প্রজ্ঞাপন।’
এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, সংগঠনটি আপাতত প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করার পরিবর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রজ্ঞাপন না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
কেন এত গুরুত্ব ৯ম পে-স্কেলে?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে নতুন পে-স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনযাত্রার ব্যয়, বিভিন্ন ভাতা, গ্রেড কাঠামো, বেতন বৈষম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কল্যাণ সমিতি এর আগে জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যম বেতনভুক্ত কর্মচারীদের ওপর চাপ বেড়েছে বলেও সংগঠনটি দাবি করেছে। ২৩ আগস্ট মুখ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠকেও সংগঠনের নেতারা এসব বিষয় তুলে ধরেন।
সর্বনিম্ন বেতন নিয়েও রয়েছে আলাদা দাবি
নবম পে-স্কেলের আলোচনায় সর্বনিম্ন বেতন কত হবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। কল্যাণ সমিতি বিভিন্ন সময়ে সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।
১৫ আগস্টের এক বিবৃতিতে সংগঠনটি সচিব কমিটির সুপারিশ করা সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতনও কমিয়ে দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন এবং দ্রুত গেজেট প্রকাশ করা জরুরি।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মচারীদের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণসহ আলাদা দাবি তুলে ৩১ আগস্টের মধ্যে গেজেট প্রকাশের সময়সীমা দিয়েছিল।
এতে বোঝা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে নবম পে-স্কেল নিয়ে মূল দাবি অভিন্ন হলেও বেতন কাঠামো ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে।
মুখ্য সচিবের আশ্বাসে আশাবাদ
নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে কল্যাণ সমিতির বৈঠক।
২৩ আগস্ট সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সংগঠনের প্রতিনিধিরা দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানান। আলোচনার একপর্যায়ে মুখ্য সচিব প্রতিনিধি দলের নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘যা দেওয়া হবে, আপনারা পেয়ে খুশি হবেন।’ সংগঠনটি এই আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের প্রত্যাশা জানিয়েছে।
এই আশ্বাসের পর ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির প্রত্যাশা আরও গুরুত্ব পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়।
এখন মূল প্রশ্ন—কবে আসবে প্রজ্ঞাপন?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নবম পে-স্কেল নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা এগিয়েছে। চলতি বছরের জুনে সরকার ১ জুলাই থেকে নবম পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। এরপরও প্রজ্ঞাপন প্রকাশ নিয়ে সময়ক্ষেপণ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
এখন কর্মচারীদের প্রত্যাশা, কার্যকর করার ঘোষণা ও প্রজ্ঞাপন জারির মধ্যে আর দীর্ঘ ব্যবধান যেন না থাকে।
কারণ, প্রজ্ঞাপন ছাড়া বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। প্রজ্ঞাপনে বেতন কাঠামো, গ্রেড, ধাপ, ভাতা, বাস্তবায়নের সময়সূচি এবং অন্যান্য শর্ত স্পষ্ট হলে কর্মচারীরা তাদের আর্থিক সুবিধার বাস্তব চিত্র জানতে পারবেন।
২০ সেপ্টেম্বরের পর কী হতে পারে?
কল্যাণ সমিতির বর্তমান বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—সংগঠনটি প্রথমে আলোচনার পথেই থাকতে চায়।
তবে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি না হলে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আপাতত কর্মবিরতি এড়িয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে চাইছে সংগঠনটি; কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে।
এখানে সরকারের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেকোনো বড় কর্মসূচি প্রশাসনিক কার্যক্রম, নাগরিক সেবা এবং সরকারি দপ্তরের দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হলে একদিকে কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে, অন্যদিকে সম্ভাব্য প্রশাসনিক অচলাবস্থার ঝুঁকিও কমবে।
সরকারের প্রতি আহ্বান
কল্যাণ সমিতির বার্তাটি মূলত সংঘাত এড়ানোর আহ্বান। সংগঠনটি বলছে, তারা কর্মবিরতি চায় না, আন্দোলনকে লক্ষ্য বানাতে চায় না এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত করাও তাদের উদ্দেশ্য নয়।
তাদের প্রত্যাশা একটাই—দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং প্রজ্ঞাপন।
সরকারের প্রতি তাদের আহ্বান, আর বিলম্ব না করে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক। একই সঙ্গে কর্মচারীদের দাবি ও বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য, বৈষম্যহীন ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা হোক।
সবশেষে, বর্তমান পরিস্থিতির সারকথা দাঁড়াচ্ছে—
সরকারি কর্মচারীরা সংঘাত চান না।
তারা কর্মবিরতি চান না।
তারা দীর্ঘ আন্দোলনও চান না।
তাদের প্রধান প্রত্যাশা—নবম পে-স্কেলের দ্রুত প্রজ্ঞাপন।
২০ সেপ্টেম্বরের সময়সীমা তাই এখন শুধু একটি তারিখ নয়; এটি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠছে।
‘আমরা কর্মবিরতি চাই না, আমরা চাই প্রজ্ঞাপন’—এই বার্তার মধ্য দিয়েই আপাতত সরকারের প্রতি আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।



