৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নতুন পে-স্কেল ‘ব্যয়’ নয়, মূল্যস্ফীতির চাপে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ: ড. তিতুমীর

নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নকে কেবল সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন বেতন কাঠামো একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগ।

বুধবার রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. তিতুমীর বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই বাস্তবতায় দীর্ঘদিনের পুরোনো বেতন কাঠামো বহাল থাকলে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের মূল উদ্দেশ্য শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং মূল্যস্ফীতির কারণে কমে যাওয়া কর্মচারীদের বাস্তব আয় ও জীবনযাত্রার সক্ষমতার সঙ্গে বেতন কাঠামোর সামঞ্জস্য তৈরি করা

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতনের বাস্তব সম্পর্ক

অর্থনীতির ভাষায় বেতন বাড়লেও মূল্যস্ফীতি যদি তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তাহলে কর্মচারীর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আয় অপরিবর্তিত বা কিছুটা বাড়লেও বাজারে পণ্য ও সেবা কেনার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যেতে পারে।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্যের মূল বার্তাও এখানেই—পে-স্কেলকে শুধু রাজস্ব ব্যয় হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যাবে না

তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। কারণ কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয় কাঠামোতে সমন্বয় না হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।

অতিরিক্ত অর্থ আসবে কোথা থেকে?

নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে?

এ বিষয়ে ড. তিতুমীর বলেন, সরকার মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (এমটিবিএফ) অনুসরণ করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। অর্থাৎ পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য কেবল নতুন ঋণ বা অতিরিক্ত চাপের ওপর নির্ভর না করে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসসহ রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিটে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এ থেকে সরকার রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

করের আওতা বাড়ানো ও কর ফাঁকি রোধে জোর

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কার আনা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—

  • করের আওতা সম্প্রসারণ
  • কর ফাঁকি রোধ
  • ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা
  • ঝুঁকিভিত্তিক অডিট
  • রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি
  • কর সংগ্রহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই ধরনের করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে নতুন করদাতাদের করজালে আনা এবং ফাঁকি ও অপচয় কমানো গেলে রাজস্ব আদায়ের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ড. তিতুমীরের বক্তব্যে সেই সংস্কারভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব সংস্কার ও পে-স্কেল একসঙ্গে এগোনোর বার্তা

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, রাজস্ব সংস্কার ও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। দুটি উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগোলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তার মতে, সরকারি কর্মচারীদের আয় সক্ষমতা বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ ও চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে, সেই ব্যয় যদি দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থায়ন করা যায়, তাহলে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

তবে অর্থনীতির দৃষ্টিতে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের প্রশ্নও রয়েছে। বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াতে পারে, কিন্তু একই সময়ে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে নতুন পে-স্কেল

দেশের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মচারীদের প্রধান প্রত্যাশাগুলোর মধ্যে রয়েছে—

বেতন কাঠামো কবে চূড়ান্ত হবে, নতুন স্কেল কার্যকর হবে কবে, গ্রেডভিত্তিক বেতন কত বাড়বে এবং বাস্তবায়নের আর্থিক কাঠামো কী হবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর।

ড. তিতুমীরের বক্তব্যে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, নতুন পে-স্কেলকে সরকার কেবল ব্যয়ের খাত হিসেবে নয়, কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা সংরক্ষণ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে

অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণ

ইআরএফ আয়োজিত ওই সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।

সেমিনারে দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব আহরণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নীতিগত সংস্কারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা

সরকারকে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বজায় রাখতে হবে।

অর্থাৎ, নতুন পে-স্কেলের সাফল্য শুধু কত টাকা বেতন বাড়ানো হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং নির্ভর করবে—

রাজস্ব আদায় কতটা বাড়ানো গেল, কর ফাঁকি কতটা কমানো গেল, সরকারি ব্যয় কতটা দক্ষ করা গেল এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেল—তার ওপরও।

সংক্ষেপে

নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তার মতে, নতুন পে-স্কেল কোনো অপ্রয়োজনীয় বা ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নয়; বরং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। আর এর অর্থায়নের পথ হিসেবে সরকার রাজস্ব সংস্কার, করের আওতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে চায়।

এখন সরকারি কর্মচারীদের নজর থাকবে—এই নীতিগত অবস্থান কবে বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপ নেয় এবং নতুন জাতীয় পে-স্কেলের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কত দ্রুত এগোয়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *