৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নতুন পে স্কেলে পুরোনো ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে কি? যে নিয়মে হতে পারে বেতন ফিক্সেশন

নতুন জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে বর্তমান বেতন স্কেলে অর্জিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টগুলো কি নতুন বেতন নির্ধারণের সময় বিবেচনায় নেওয়া হবে? বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করবে নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনে বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’ সংক্রান্ত বিধান কীভাবে দেওয়া হয় তার ওপর।

নতুন পে স্কেল ঘোষণা হলে শুধু নতুন গ্রেডের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করলেই বিষয়টির সমাধান হবে না। বর্তমানে কর্মরত একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন কাঠামোয় কোন ধাপে বেতন পাবেন, বর্তমান মূল বেতন কীভাবে সমন্বয় হবে এবং ইতোমধ্যে অর্জিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের আর্থিক সুবিধা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—এসব বিষয়ই তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

পুরোনো ইনক্রিমেন্ট নিয়ে মূল প্রশ্ন

বর্তমান পে স্কেলে একজন কর্মচারী নিয়োগের পর প্রতিবছর নির্ধারিত নিয়মে ইনক্রিমেন্ট পেয়ে তার মূল বেতন ধাপে ধাপে বাড়ান। ফলে একই গ্রেডে কর্মরত দুজন কর্মচারীর মূল বেতন এক নাও হতে পারে।

ধরা যাক, নতুন পে স্কেলের কোনো গ্রেডের প্রথম ধাপ নির্ধারণ করা হলো ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু ওই গ্রেডে বর্তমানে একজন কর্মচারী একাধিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে মূল বেতন ২১ হাজার ৩১০ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করেছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—নতুন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর তাকে কি শুধু নতুন স্কেলের নির্ধারিত ২৩ হাজার ৫০০ টাকা ধাপে বসিয়ে দেওয়া হবে, নাকি তার বর্তমান বেতন ও অর্জিত ইনক্রিমেন্ট বিবেচনা করে নতুন স্কেলের আরও উপযুক্ত কোনো ধাপে ফিক্সেশন করা হবে?

এই জায়গাটিই নতুন পে স্কেলের বেতন ফিক্সেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

দুটি পদ্ধতিতে হতে পারে বেতন নির্ধারণ

নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপনে বেতন ফিক্সেশনের বিধান অনুযায়ী সাধারণভাবে দুটি ধরনের পদ্ধতির সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে।

প্রথমত, বর্তমান মূল বেতন ও অর্জিত ইনক্রিমেন্ট বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণ।

এ পদ্ধতিতে কর্মচারীর নতুন বেতন নির্ধারণের সময় বর্তমান মূল বেতনকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। অর্থাৎ, তিনি বর্তমান স্কেলে যতগুলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট অর্জন করেছেন, তার আর্থিক অবস্থানকে কোনো না কোনোভাবে নতুন স্কেলের বেতন নির্ধারণে প্রতিফলিত করার সুযোগ থাকতে পারে।

এক্ষেত্রে নতুন স্কেলে একই গ্রেডের কর্মীদের মধ্যে আগে থেকে কর্মরত এবং বেশি ইনক্রিমেন্টপ্রাপ্ত কর্মচারী তুলনামূলকভাবে উচ্চতর ধাপে যেতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, নতুন স্কেলের নির্ধারিত ধাপ অনুযায়ী সরাসরি ফিক্সেশন।

এ পদ্ধতিতে বর্তমান বেসিক ও ইনক্রিমেন্টের পরিবর্তে নতুন পে স্কেলের নির্ধারিত ধাপের সঙ্গে মিলিয়ে কর্মচারীর বেতন সরাসরি নির্ধারণ করা হতে পারে।

তবে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা হলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসবে—বর্তমান স্কেলে দীর্ঘদিন চাকরি করে অর্জিত ইনক্রিমেন্টের আর্থিক সুবিধা তাহলে কতটা সংরক্ষিত থাকবে?

২১,৩১০ টাকা থেকে ২৩,৫০০ টাকা—শুধু এই হিসাবই কি যথেষ্ট?

ধরা যাক, একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন ২১,৩১০ টাকা। নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট গ্রেডের প্রথম ধাপ যদি ২৩,৫০০ টাকা হয়, তাহলে সরল হিসাবে তার নতুন মূল বেতন ২৩,৫০০ টাকা হতে পারে।

কিন্তু এখানে আরেকটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। ওই কর্মচারী বর্তমান স্কেলে কত বছর চাকরি করেছেন, কতগুলো ইনক্রিমেন্ট অর্জন করেছেন এবং নতুন স্কেলে একই গ্রেডের ধাপগুলো কীভাবে সাজানো হয়েছে—এসব বিষয় বেতন ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অর্থাৎ,

বর্তমান বেসিক → নতুন স্কেলের সঙ্গে সমন্বয় → অর্জিত ইনক্রিমেন্টের সুবিধা বিবেচনা → উপযুক্ত ধাপে বেতন ফিক্সেশন

—এমন একটি কাঠামো থাকলে পুরোনো কর্মচারীদের অর্জিত বেতন-সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত থাকতে পারে।

ইনক্রিমেন্ট কি সরাসরি ‘যোগ’ হবে?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ‘পুরোনো ইনক্রিমেন্ট যোগ হবে’ কথাটির অর্থ সবসময় ইনক্রিমেন্টের টাকার অঙ্ক সরাসরি নতুন মূল বেতনের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া নয়।

বরং নতুন পে স্কেলের ফিক্সেশন বিধিতে এমন পদ্ধতি থাকতে পারে, যার মাধ্যমে বর্তমান বেতন ও অর্জিত ইনক্রিমেন্টের কারণে কর্মচারীর যে বেতন অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেটি নতুন স্কেলের উপযুক্ত ধাপ নির্ধারণে বিবেচনা করা হবে।

তাই নতুন স্কেল ঘোষণার আগে উদাহরণভিত্তিক হিসাব করে নিশ্চিতভাবে বলা—‘সব পুরোনো ইনক্রিমেন্ট সরাসরি যোগ হবে’ অথবা ‘একটিও ইনক্রিমেন্ট বিবেচনা করা হবে না’—দুটিই অতিরঞ্জিত দাবি হতে পারে।

কর্মচারীদের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

একটি নতুন পে স্কেলের উদ্দেশ্য শুধু বেতন বাড়ানো নয়; একই সঙ্গে নতুন কাঠামোয় কর্মরত কর্মীদের বেতন-অবস্থান, পূর্বের অর্জিত সুবিধা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের বেতন বৈষম্য কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে একই গ্রেডে দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মচারী এবং সদ্য ওই গ্রেডে প্রবেশ করা কর্মচারীর বেতন যদি নতুন স্কেলে প্রায় একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে পুরোনো কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এ কারণেই বেতন ফিক্সেশনের সময় ‘অর্জিত বেতন সুবিধা সংরক্ষণ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

‘ন্যায্য ফিক্সেশন’ নিয়ে প্রত্যাশা

কর্মচারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে—নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণের সময় বর্তমান মূল বেতন এবং পূর্বে অর্জিত ইনক্রিমেন্টের আর্থিক সুবিধাকে যথাসম্ভব সুরক্ষা দিয়ে নতুন স্কেলের উপযুক্ত ধাপে ফিক্সেশন করা।

এতে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের পর কর্মচারী নতুন কাঠামোর সুবিধা পাবেন, আবার পূর্বের চাকরিকাল ও ইনক্রিমেন্টের কারণে অর্জিত বেতন-সুবিধাও অযথা হারানোর আশঙ্কা কমবে।

তবে এটিকে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য বেতন ফিক্সেশন পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের ভাষা ও ফিক্সেশন বিধির ওপর।

কোন বিষয়গুলো দেখলেই চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যাবে?

নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হলে কর্মচারীদের বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয় খুঁজে দেখা প্রয়োজন হবে—

  • বর্তমান মূল বেতন কীভাবে নতুন স্কেলে সমন্বয় করা হবে;
  • পূর্বে অর্জিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কীভাবে বিবেচনা করা হবে;
  • নতুন স্কেলের কোন ধাপে বেতন ফিক্সেশন হবে;
  • বেতন ফিক্সেশনে ‘পরবর্তী উচ্চতর ধাপ’ বা অনুরূপ কোনো বিধান আছে কি না;
  • নতুন বেতন পুরোনো বেতনের তুলনায় কমে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না;
  • ভবিষ্যৎ ইনক্রিমেন্টের তারিখ কীভাবে নির্ধারিত হবে;
  • নতুন স্কেলে ফিক্সেশনের পর পরবর্তী ইনক্রিমেন্ট কীভাবে গণনা করা হবে।

এসব বিধান না দেখে শুধুমাত্র নতুন স্কেলের প্রথম ধাপের বেতন উল্লেখ করে প্রত্যেক কর্মচারীর নতুন বেতন নির্ধারণ করা সঠিক হবে না।

শেষ কথা

নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে পুরোনো ইনক্রিমেন্টের সুবিধা কীভাবে প্রতিফলিত হবে—এটাই এখন কর্মচারীদের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারও বর্তমান বেসিক ২১,৩১০ টাকা এবং নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট প্রথম ধাপ ২৩,৫০০ টাকা হলেই যে তার বেতন ঠিক ২৩,৫০০ টাকাতেই চূড়ান্ত হবে, এমন সিদ্ধান্ত আগেভাগে দেওয়া যায় না।

কারণ নতুন পে স্কেলের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বেতন ফিক্সেশন বিধি, ধাপ নির্ধারণের পদ্ধতি এবং পূর্বে অর্জিত ইনক্রিমেন্টের সুবিধা সংরক্ষণের নিয়মের ওপর।

তাই গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ‘বেতন নির্ধারণ/ফিক্সেশন’ অংশটি বিশ্লেষণ করেই প্রত্যেক গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টের ভিত্তিতে নতুন বেতন নির্ধারণ করা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হবে।

সংক্ষেপে: নতুন পে স্কেলে পুরোনো ইনক্রিমেন্ট ‘যোগ হবে’—এ কথা এখনই নিশ্চিত নয়; তবে কর্মচারীদের অর্জিত ইনক্রিমেন্টের আর্থিক সুবিধা সংরক্ষণ করে ন্যায্য ধাপে ফিক্সেশন করাই হতে পারে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *