নবম পে-স্কেলে ৫ ধাপে বাড়বে পেনশন, সর্বোচ্চ বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ
নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের পর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে যে নিট পেনশন পাওয়া যাচ্ছে, তার পরিমাণের ভিত্তিতে পেনশনভোগীদের পাঁচটি স্তরে ভাগ করে ৫৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়ানো হবে। বিশেষ করে কম পেনশন পাওয়া এবং দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া পেনশনভোগীরাই এ সিদ্ধান্তে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন।
মন্ত্রিসভা অনুমোদিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬–এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেনশন বৃদ্ধির হার সবার জন্য সমান রাখা হয়নি। বর্তমান নিট পেনশনের পরিমাণ যত কম, বৃদ্ধির হার তত বেশি—এমন একটি স্ল্যাবভিত্তিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই বর্তমানে একই পদ বা গ্রেড থেকে নতুন করে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম পেনশন পাচ্ছেন। ফলে কম পেনশনভোগীদের বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে এ বৈষম্য কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
কোন পেনশন কত শতাংশ বাড়বে
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচটি স্তরে নিট পেনশন বৃদ্ধির হার হবে—
| বর্তমান মাসিক নিট পেনশন | বৃদ্ধির হার |
|---|---|
| ৯,০০০ টাকা বা কম | ১০০% |
| ৯,০০১–২০,০০০ টাকা | ৭৫% |
| ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা | ৬৫% |
| ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা | ৬০% |
| ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি | ৫৫% |
অর্থাৎ সবচেয়ে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বর্তমান নিট পেনশনের সমপরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত যোগ হবে। অন্যদিকে যাদের নিট পেনশন তুলনামূলক বেশি, তাদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে।
৯ হাজার টাকা পেনশন হলে হবে ১৮ হাজার
ধরা যাক, কোনো পেনশনভোগী বর্তমানে মাসে ৯,০০০ টাকা নিট পেনশন পাচ্ছেন। তাঁর ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে নতুন পেনশন হবে—
৯,০০০ + ৯,০০০ = ১৮,০০০ টাকা।
অর্থাৎ মাসে সরাসরি ৯,০০০ টাকা বৃদ্ধি পাবেন।
একইভাবে, কেউ যদি বর্তমানে ২০,০০০ টাকা নিট পেনশন পান, তাহলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে তাঁর নতুন পেনশন দাঁড়াবে—
২০,০০০ + ১৫,০০০ = ৩৫,০০০ টাকা।
আবার ৩০,০০০ টাকা নিট পেনশন হলে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির পরিমাণ হবে ১৯,৫০০ টাকা। ফলে নতুন পেনশন হবে ৪৯,৫০০ টাকা।
আর ৪০,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি অর্থাৎ ২৪,০০০ টাকা যোগ হয়ে নতুন পেনশন দাঁড়াবে ৬৪,০০০ টাকা। এসব উদাহরণও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
৪০ হাজারের বেশি পেনশনেও ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি
পঞ্চম ও সর্বোচ্চ পেনশন স্ল্যাবে রয়েছেন যাঁরা বর্তমানে ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাচ্ছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ শতাংশ।
অর্থাৎ কারও বর্তমান নিট পেনশন যদি ৫০ হাজার টাকা হয়, তাহলে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাবে অতিরিক্ত ২৭ হাজার ৫০০ টাকা যোগ হয়ে তা ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৫৫ শতাংশ কোনো সর্বোচ্চ সীমা নয়; এটি সর্বোচ্চ পেনশন স্ল্যাবের জন্য নির্ধারিত বৃদ্ধির হার। অন্যদিকে সর্বোচ্চ শতাংশ বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ, যা প্রযোজ্য হবে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে।
কেন কম পেনশনভোগীদের বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে?
নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৃদ্ধির হার নির্ধারণে সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্যকে বিবেচনায় নেওয়া।
বছরের পর বছর আগে অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ তুলনামূলক কম মূল বেতন ও পুরোনো বেতন কাঠামোর ভিত্তিতে পেনশন পাচ্ছেন। ফলে একই পদ বা গ্রেডে বর্তমানে অবসর নেওয়া ব্যক্তির তুলনায় তাঁদের মাসিক পেনশন অনেক কম হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরাই বেশি হারে বৃদ্ধি পাবেন। এর মাধ্যমে অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো ও নতুন পেনশনভোগীদের মধ্যে ব্যবধান কিছুটা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ২০৩০ সালের মধ্যে
পেনশন বৃদ্ধির এই পাঁচ স্তরের ব্যবস্থা মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা One Rank One Pension (OROP) ব্যবস্থা চালু করা।
সামরিক ও অসামরিক—উভয় ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একবারে এটি চালু করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন এবং অসামরিক কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে সরকার পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমানে যে পাঁচ স্ল্যাবে নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিকে ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত উপকৃত হতে পারেন
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীরাও আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন। সরকারি হিসাবে প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এ ব্যবস্থার আওতায় আসবেন বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হবে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন। ফলে পেনশন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত আর্থিক দায় তৈরি হবে।
পেনশনভোগীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এই সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পেনশন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার একই হারে সবার পেনশন বাড়ানোর পরিবর্তে প্রগতিশীল স্ল্যাব পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। ফলে—
- ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীর পেনশন দ্বিগুণ হবে;
- ৯,০০১–২০,০০০ টাকা পেনশনভোগীরা ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবেন;
- ২০,০০১–৩০,০০০ টাকা পেনশনভোগীরা ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবেন;
- ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা পেনশনভোগীরা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবেন;
- ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি পেনশনভোগীরা ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবেন।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—এগুলো বর্তমান নিট পেনশনের ওপর নির্ধারিত বৃদ্ধির হার। তাই কারও মূল পেনশন, মোট পেনশন, ভাতা বা অন্যান্য অবসর-পরবর্তী সুবিধার অঙ্ক দেখে সরাসরি এই শতাংশ প্রয়োগ করলে হিসাব ভুল হতে পারে। চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট বিধি-নির্দেশনায় ফিক্সেশন, কার্যকর তারিখ, বকেয়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় স্পষ্ট হওয়ার পরই প্রত্যেক পেনশনভোগীর প্রকৃত প্রাপ্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যাবে।
সারকথা
নবম জাতীয় পে-স্কেলে পেনশনভোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—পেনশন আর এক হারে বাড়ছে না; বর্তমান নিট পেনশনের পরিমাণ অনুযায়ী পাঁচটি স্তরে ৫৫%, ৬০%, ৬৫%, ৭৫% ও ১০০% হারে বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি শতাংশ সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করায় বর্তমান সিদ্ধান্তকে শুধু তাৎক্ষণিক পেনশন বৃদ্ধি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পেনশন সংস্কারের একটি ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


