বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

পে স্কেলে গ্রেডভিত্তিক বেতন বৈষম্যের অঙ্ক: ১১–২০ গ্রেডে কেন এত কম পার্থক্য?

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে—নতুন বেতন কাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির পার্থক্য কতটা যৌক্তিক? বিশেষ করে উচ্চ গ্রেড ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

এরই মধ্যে অনেকে জানতে চাইছেন, আজই কি নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হবে? সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা না পাওয়া পর্যন্ত গেজেট প্রকাশের সময় নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। ফলে আজ গেজেট প্রকাশ না হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনায় থাকা বিভিন্ন বেতন কাঠামোকে সম্ভাব্য হিসাব হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—গ্রেডের ব্যবধান অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির অঙ্ক কতটা ভারসাম্যপূর্ণ?

২০টি গ্রেডকে দুই ভাগে দেখলে যে চিত্র পাওয়া যায়

প্রচলিত আলোচনায় ২০টি বেতন গ্রেডকে যদি দুটি সমান ভাগে ভাগ করা হয়, তাহলে—

প্রথম ভাগ: ১ম থেকে ১০ম গ্রেড
দ্বিতীয় ভাগ: ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড

এই দুই অংশের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের ব্যবধানের দিকে তাকালে একটি উল্লেখযোগ্য বৈষম্যের চিত্র পাওয়া যায়।

১ম–১০ম গ্রেডের হিসাব

আলোচনায় থাকা হিসাব অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের মূল বেতন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং ১০ম গ্রেডের মূল বেতন ৩২ হাজার টাকা

অর্থাৎ,

১,৫৬,০০০ – ৩২,০০০ = ১,২৪,০০০ টাকা।

অর্থাৎ ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের পুরো ব্যবধানে মূল বেতনের পার্থক্য ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা

১০টি গ্রেডের মধ্যে এই ব্যবধানকে সরল গড় হিসেবে ভাগ করলে প্রতি গ্রেডে গড়ে প্রায় ১২ হাজার ৪০০ টাকা করে পার্থক্য দাঁড়ায়।

অবশ্য এটি একটি গাণিতিক গড়; প্রকৃত পে-স্কেলে প্রতিটি গ্রেডের ব্যবধান সমান হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

১১–২০ গ্রেডে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন

অন্যদিকে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন যদি ২৫ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা ধরা হয়, তাহলে—

২৫,০০০ – ২০,০০০ = ৫,০০০ টাকা।

অর্থাৎ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত পুরো ১০টি গ্রেডের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫ হাজার টাকা

সরল গড় হিসাবে ১০টি গ্রেডে ভাগ করলে প্রতি গ্রেডে পার্থক্য দাঁড়ায় মাত্র ৫০০ টাকা

এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একদিকে ১ম–১০ম গ্রেডে গড় ব্যবধান প্রায় ১২ হাজার ৪০০ টাকা; অন্যদিকে ১১–২০ গ্রেডে গড় ব্যবধান মাত্র ৫০০ টাকা।

অর্থাৎ দুটি অংশের গড় ব্যবধানের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে।

মাত্র এক গ্রেডের ব্যবধানেই ৭ হাজার টাকা!

আরও বিস্ময়কর হিসাব পাওয়া যায় ১০ম ও ১১তম গ্রেডের তুলনায়।

যদি ১০ম গ্রেডের মূল বেতন ৩২ হাজার টাকা এবং ১১তম গ্রেডের মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা হয়, তাহলে—

৩২,০০০ – ২৫,০০০ = ৭,০০০ টাকা।

অর্থাৎ মাত্র একটি গ্রেডের ব্যবধানেই ৭ হাজার টাকা

অথচ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত পুরো ১০টি গ্রেডে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল বেতনের ব্যবধান মাত্র ৫ হাজার টাকা

অঙ্কের ভাষায় বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে—

১০ম ও ১১তম গ্রেডের এক ধাপের পার্থক্য = ৭,০০০ টাকা
১১তম ও ২০তম গ্রেডের ১০ ধাপের মোট পার্থক্য = ৫,০০০ টাকা

এই হিসাবই মূলত নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

তাহলে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির হিসাব কীভাবে আসে?

নিম্নতম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার দিয়ে পে-স্কেলের সাফল্য তুলে ধরার ক্ষেত্রেও একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি।

ধরা যাক, পূর্বের সর্বনিম্ন মূল বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং নতুন কাঠামোয় তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। তাহলে বৃদ্ধির পরিমাণ—

২০,০০০ – ৮,২৫০ = ১১,৭৫০ টাকা।

শতকরা বৃদ্ধির হার হবে—

(১১,৭৫০ ÷ ৮,২৫০) × ১০০ ≈ 142.4%

অর্থাৎ প্রায় ১৪২ শতাংশ

গাণিতিকভাবে এই হিসাব সঠিক হতে পারে। কিন্তু শুধুমাত্র শতাংশ বৃদ্ধির হার দিয়ে বেতন কাঠামোর সামগ্রিক ন্যায্যতা বিচার করা যায় না।

কারণ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব নির্ভর করে প্রাথমিক বেতন কত ছিল তার ওপর

একই ১০ হাজার টাকা বৃদ্ধি কোনো নিম্ন বেতনভোগীর ক্ষেত্রে শতকরা হিসাবে অনেক বড় বৃদ্ধি দেখাতে পারে; কিন্তু উচ্চ বেতনভোগীর ক্ষেত্রে একই পরিমাণ বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম শতাংশ হবে।

তাই পে-স্কেল মূল্যায়নে অন্তত তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন—

১. মূল বেতন কত টাকা বেড়েছে
২. শতকরা কত বেড়েছে
৩. গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতন ব্যবধান কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে

‘বানরের রুটিভাগ’ গল্পের সঙ্গে তুলনা কেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় অনেকে এই পরিস্থিতিকে প্রচলিত ‘বানরের রুটিভাগের গল্প’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

গল্পটিতে দুই পক্ষের রুটি ভাগ করতে গিয়ে মধ্যস্থতাকারী বারবার নিজের অংশ কেটে নেয়—শেষ পর্যন্ত মূল অংশগ্রহণকারীদের হাতে প্রত্যাশার তুলনায় কম অংশ থাকে।

পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও সমালোচকদের প্রশ্ন হচ্ছে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মোট বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে এত কম কেন?

তবে এই তুলনাকে বাস্তব পে-স্কেল প্রণয়নের প্রক্রিয়ার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বেতন কাঠামো নির্ধারণে সরকারি রাজস্ব, পদমর্যাদা, দায়িত্ব, যোগ্যতা, বাজারমূল্য, বিদ্যমান বেতন কাঠামো, ভাতা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাসহ বহু বিষয় বিবেচনা করা হয়।

মূল প্রশ্ন: ‘বৃদ্ধির হার’ নাকি ‘বেতন ব্যবধান’?

এখানেই পে-স্কেল বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি রয়েছে।

নিম্নতম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি হয়েছে—এটি এক ধরনের পরিসংখ্যান।

অন্যদিকে ১০ম ও ১১তম গ্রেডের মধ্যে ৭ হাজার টাকা পার্থক্য, অথচ ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে মোট পার্থক্য ৫ হাজার টাকা—এটি আরেক ধরনের পরিসংখ্যান।

দুটি হিসাব একই বিষয় নির্দেশ করে না।

প্রথমটি দেখায় আগের বেতনের তুলনায় কত শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে

দ্বিতীয়টি দেখায় নতুন কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন গ্রেডের বেতন কীভাবে ছড়িয়ে আছে

তাই একটি পে-স্কেল কতটা ন্যায্য তা নির্ধারণ করতে হলে শুধু ‘সর্বনিম্ন বেতন কত শতাংশ বেড়েছে’—এই একটি সূচক যথেষ্ট নয়।

নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সরকারি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অফিস সহায়ক, প্রশাসনিক সহায়ক, কারিগরি ও বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের কর্মীসহ বহু পদ এই নিম্ন গ্রেডগুলোর মধ্যে রয়েছে।

তাদের জীবনযাত্রার ব্যয়ও একই বাজারে বাড়ে। খাদ্য, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতির প্রভাব পড়ে।

সুতরাং নিম্ন গ্রেডে শুধু শতকরা বৃদ্ধির সংখ্যা দেখানো হলে বাস্তবে কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত কত টাকা যাচ্ছে এবং সেই অর্থ দিয়ে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা সামাল দেওয়া সম্ভব—সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘শোষণের আরেক নাম আমলাতন্ত্র’—এমন বক্তব্য কতটা যৌক্তিক?

পে-স্কেল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে কেউ কেউ আমলাতন্ত্রকে সরাসরি ‘শোষণের’ সঙ্গে তুলনা করছেন।

এ ধরনের বক্তব্য মূলত সমালোচনামূলক মতামত। এটি কোনো নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।

তবে এই বক্তব্যের পেছনে যে প্রশ্নটি রয়েছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই—বেতন কাঠামো তৈরির সময় নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে চূড়ান্ত গেজেটের পাশাপাশি পে-স্কেল কমিশনের সুপারিশ, সরকারের অনুমোদিত কাঠামো এবং গ্রেডভিত্তিক বেতন নির্ধারণের যুক্তি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

শেষ কথা

পে-স্কেল শুধু কয়েকটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ।

তাই ‘সর্বনিম্ন বেতন ১৪২ শতাংশ বেড়েছে’—এই একটি পরিসংখ্যান দিয়ে যেমন পুরো পে-স্কেলকে অসাধারণ বলা ঠিক হবে না, তেমনি শুধুমাত্র কয়েকটি গ্রেডের ব্যবধান দেখে পুরো কাঠামোকে অন্যায্য বলাও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

তবে ১০ম ও ১১তম গ্রেডের ৭ হাজার টাকা ব্যবধান, আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে মাত্র ৫ হাজার টাকা মোট ব্যবধান—এই অঙ্কটি নিঃসন্দেহে বড় একটি প্রশ্ন তৈরি করে।

প্রশ্নটি তাই এখন শুধু ‘বেতন কত বাড়ল’ নয়; বরং ‘কোন গ্রেডে কতটা বাড়ল এবং গ্রেডগুলোর মধ্যে সেই বণ্টন কতটা যৌক্তিক’—সেটিই হওয়া উচিত পে-স্কেল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পরই এই প্রশ্নগুলোর আরও নির্ভুল উত্তর পাওয়া যাবে। তখন প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, ফিক্সেশন এবং আগের কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করে পূর্ণাঙ্গ হিসাব করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *