নবম পে-স্কেল ২০২৬: সর্বশেষ অবস্থা কোথায়, কীভাবে এগোচ্ছে?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ এখন বাস্তবায়নের একেবারে শেষ ধাপে রয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং বা আইনগত যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। ভেটিং শেষ হলে প্রয়োজনীয় এসআরও নম্বর দিয়ে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
পে-স্কেল এখন ঠিক কোথায়?
বর্তমান অবস্থাকে এক কথায় বলা যায়—“অনুমোদন শেষ, গেজেটের আগে আইনি যাচাই চলছে।”
প্রক্রিয়াটি এখন পর্যন্ত মোটামুটি এভাবে এগিয়েছে—
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ
↓
সচিব কমিটির পর্যালোচনা ও সুপারিশ
↓
মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন
↓
৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ✅
↓
প্রজ্ঞাপন প্রস্তুত
↓
আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং 🔄
↓
এসআরও নম্বর ⏳
↓
সরকারি গেজেট প্রকাশ ⏳
↓
iBAS++-এ বেতন পুনর্নির্ধারণ
↓
বাস্তবায়ন
অর্থাৎ, পে-স্কেল এখন আর অনুমোদনের অপেক্ষায় নেই। মূল সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে; এখন চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা চলছে।
কেন গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগছে?
৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর দ্রুত গেজেট প্রকাশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গেজেট প্রকাশ হয়নি। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপনটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বেতন নির্ধারণ, শিক্ষাভাতা, বাড়িভাড়াসহ কয়েকটি ভাতা এবং জুডিশিয়ারি সার্ভিসের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।
তাই গেজেট বিলম্বকে শুধু একটি কারণে আটকে থাকা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং আইনি যাচাই ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয় চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে বলেই সর্বশেষ তথ্য থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে।
গেজেট প্রকাশের পর কী হবে?
গেজেট প্রকাশের পরই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের জন্য সাতটি পৃথক এসআরও জারির মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো প্রয়োগের বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে iBAS++-এ প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ ও বেতন নির্ধারণের কারিগরি প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
এর অর্থ, গেজেট প্রকাশের পরও কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বেতন হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে একদিনে পরিবর্তিত হয়ে যাবে—এমন নয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও iBAS++ ব্যবস্থায় কর্মচারীর গ্রেড, বর্তমান মূল বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হবে।
২০টি গ্রেডই থাকছে
নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত দুটি অঙ্ক হলো—
- ২০তম গ্রেড: ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা
- ১ম গ্রেড: ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৫৬,০০০ টাকা
অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪২ শতাংশ, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতনের অনুপাতও আগের ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করার কথা বলা হয়েছে।
একবারে পুরো বেতন বাড়বে না
নতুন পে-স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হলেও বাড়তি অংশ ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে বাড়তি মূল বেতনের অংশ প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ হারে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডে বাড়তি অংশ ৪০ শতাংশ + ৩০ শতাংশ + ৩০ শতাংশ হারে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে “২০তম গ্রেডে বেতন ২০ হাজার টাকা হয়েছে” কথাটির অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক কর্মচারী গেজেট প্রকাশের পরের মাস থেকেই নতুন কাঠামোর পূর্ণ সুবিধা হাতে পাবেন। বেতন ফিক্সেশন ও ধাপে বাস্তবায়নের নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃত মাসিক বেতন নির্ধারিত হবে।
কার্যকর তারিখ ১ জুলাই ২০২৬
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামোর কার্যকারিতা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধরা হয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশে সময় লাগলেও কার্যকর তারিখ পিছিয়ে যাচ্ছে না।
এর ফলে জুলাই থেকে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত সময়ের বেতন নতুন কাঠামো অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ করে বর্ধিত অর্থ বকেয়া বা সমন্বয় হিসেবে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গেজেট প্রকাশ ও বাস্তবায়নের চূড়ান্ত নির্দেশনায় এ বিষয়ে বিস্তারিত পদ্ধতি স্পষ্ট হবে।
ভাতা নিয়ে কী হবে?
শুধু মূল বেতন নয়, নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা নিয়েও সরকারি চাকরিজীবীদের আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা কীভাবে পরিবর্তিত হবে, সেটি গেজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতে স্পষ্ট হবে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মূল বেতন বৃদ্ধি এবং সব ভাতা একই সময়ে একই হারে কার্যকর হবে—এমন নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভাতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে।
iBAS++-এও চলছে প্রস্তুতি
পে-স্কেল বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি অংশ হলো iBAS++। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
এ কারণে গেজেট প্রকাশের আগেই সিস্টেমে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কর্মচারীদের তথ্য যাচাই ও হালনাগাদ করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে নতুন মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতা নির্ধারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে বেতন ফিক্সেশনে হাতে-কলমে হিসাবের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।
তাহলে সরকারি চাকরিজীবীদের এখন কী অপেক্ষা?
বর্তমানে চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা গেজেটের জন্য। কারণ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেলেও চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ সম্পূর্ণ হয় না।
বর্তমান অবস্থাটি তাই এমন—
| ধাপ | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| পে-স্কেল প্রস্তাব | ✅ সম্পন্ন |
| সচিব কমিটির পর্যালোচনা | ✅ সম্পন্ন |
| মন্ত্রিসভায় অনুমোদন | ✅ ৩১ আগস্ট সম্পন্ন |
| প্রজ্ঞাপন প্রস্তুতি | ✅ সম্পন্ন |
| আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং | 🔄 চলমান |
| এসআরও নম্বর | ⏳ পরবর্তী ধাপ |
| গেজেট | ⏳ অপেক্ষমাণ |
| iBAS++-এ বেতন ফিক্সেশন | ⏳ গেজেটের পর |
| নতুন বেতন বাস্তবায়ন | ⏳ প্রক্রিয়াধীন |
শেষ কথা
সবকিছু মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ এখন আর প্রস্তাব বা অনুমোদনের পর্যায়ে নেই। এটি গেজেট প্রকাশের ঠিক আগের গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক ধাপে রয়েছে।
৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং → এসআরও নম্বর → গেজেট → iBAS++-এ বেতন নির্ধারণ → বাস্তবায়ন—এই ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত চূড়ান্ত বেতন-ফিক্সেশন, ব্যক্তিভেদে বকেয়া এবং সব ভাতার প্রকৃত হিসাবকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা সরকারি প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতেই নির্ধারিত হবে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে গেজেট প্রকাশে আরও কিছু সময় লাগার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে প্রকাশের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে—তবে এটি সম্ভাব্য সময়, নিশ্চিত সরকারি তারিখ নয়।
অর্থাৎ, পে-স্কেলের বর্তমান অবস্থাকে এক লাইনে বললে: “মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে, গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায়।”


